তেলেভাজা – শান্তনু মুখার্জ্জী (জয়)

*********************************
beautyplus_20190512134821768_save2170784158866820798.jpg-“এই কোয়ার্টারেও টার্গেটটা মিট করতে পারলে না শুভাশিস।”
শ্লেষের সুরে বলল কোম্পানির ভিপি সেলস সুনন্দ সেন।
শুভাশিসের অবশ্য তেমন কোন বিকার নেই। বত্রিশটা দাঁতের মধ্যে উনিশটা সবসময়েই বেরিয়ে আছে। যেন এই টার্গেট , সেলস ইত্যাদি পার্থিব বস্তুর সাথে তার কোনো সম্পর্কই নেই। হলে হলো না হলে না হলো গোছের একটা ব্যাপার। মাঝে মাঝে সুনন্দর মনে হয় যে ওর গায়ে মানুষের নয় গন্ডারের চামড়া। কোনো কথাই সে যেন গায়ে মাখে না।
মুচকি হেসে সে বললো , “টার্গেট স্যার মিট করেছি তবে ওই বোনাসের জন্য যে অতিরিক্ত আমাউন্ট টা করতে বলেন সেটা হয়নি। ”
সুনন্দ অবাক হয়ে বললো, “তোমার লজ্জা করে না । বাকিদের দেখ। দিন রাত পরিশ্রমে টার্গেট ওভার এচিভ করে মোটা মোটা বোনাস নিয়ে যাচ্ছে। আর সেখানে তুমি ডাহা ফেল।”
শুভাশিস ঘাড় গুঁজে তার স্বভাব সিদ্ধ পিত্তি জ্বালানো ভঙ্গিতে বললো ,”অতো টাকা কি হবে? এই তো বেশ চলে যাচ্ছে”
সুনন্দও নাছোড়বান্দা । সে বুঝিয়েই ছাড়বে যে প্রত্যেক মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির প্রয়োজন আছে।
তাই সে এবার তার মোক্ষম চালটা চলল।
সুনন্দ এবার সহমর্মিতার সুরে বলল , “দ্যাখ শুভাশিস , তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু। অন্য কেউ হলে আমি এত করে বলতাম না । টাকা দিয়ে তোর কি হবে আমি বলতে পারব না কিন্তু তোর স্ত্রী আছে , ছেলে মেয়ে আছে। ওদের কেন বঞ্চিত করছিস। ওদেরও তো ইচ্ছে হয় যে তুই মাঝে মাঝে নানা রকম গিফ্ট নিয়ে যা। রেস্টুরেন্টে গিয়ে ওদের নিয়ে ডিনার কর। ছুটিতে কেরালা বা গোয়া বেড়াতে যা।”
শুভাশিস মৃদু হেসে বললো , “বন্ধু ? ও হ্যাঁ তাই তো। সেটা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। বস বলেই জানি এখন।”
সুনন্দ বলল , “এ তোর রাগের কথা। আমি তোর ভালোর জন্য বলছি আর তুই আমার ভুল বুঝছিস। তুই আমাকেই দেখ। একসাথেই এই চাকরিতে ঢুকেছিলাম। দিন , রাত, ছুটি কিচ্ছু তোয়াক্কা করিনি। শুধু খেটে গেছি। ভিপি তো আর এমনি হইনি। ”
শুভাশিস এর কোন উত্তর না দিয়ে শুধু হাসলো একবার। তারপর বলল , “তোর অফিসের পর আজ কি কাজ?”
সুনন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “কি আবার। রোজকার রুটিন। বাড়ি ফিরবো। কাজের মাসি চা দেবে। তারপর স্নান। আর তারপর হুইস্কির গ্লাস নিয়ে টিভি।”
শুভাশিস জিগেস করলো , “কেন তোর স্ত্রী?”
সুনন্দ হেসে বললো , “ওর রোজই নানা রকম এনগেজমেন্ট থাকে। আজ রথ উপলক্ষে ওর এক বান্ধবীর বাড়ি কিটি পার্টি।
-“আর ছেলে?”
-“ওর সাত দিনে সাতটা টিচার। তারপর, মোবাইলে হয় ইউ টিউব নয় ভিডিও গেমস।”
শুভাশিস একটু ভেবে বললো , “তার মানে বিশেষ কোনো কাজ নেই। আমার সাথে একটা জায়গায় যাবি?”
-“কোথায়?” – বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো সুনন্দ
তাকে আরো বিস্মিত করে উত্তর এলো -“রথের মেলায়”।

গাড়িটা একটু দূরে পার্ক করে কালীতলার মাঠে রথের মেলায় ঢুকলো সুনন্দ আর শুভাশিস। কতদিন পর সুনন্দ রথের মেলায় এলো। এই তো প্রকৃত মেলা। এক্সহিবিসন হলে সে যায় বটে কিন্তু সেটা মেলা নয়।

বনবন করে নাগরদোলা ঘুরছে। দোকানিরা কান ফাটা চিৎকারে তাদের জিনিস পত্রের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করছে। আইসক্রিমওয়ালার ব্যস্ততার শেষ নেই।

সুনন্দর মধ্যের ছেলে মানুষটা যেন বেরিয়ে এলো। খপ করে শুভাসিসের হাত খামচে বললো , “নাগরদোলায় চড়বো। ”

শুভাশিস ইতস্ততঃ করে বললো, “এই বয়সে ওসব করিস না”

কিন্তু সুনন্দ চড়বেই। হঠাৎ ভিড় ঠেলে দুটো ছোট ছোট ছেলে মেয়ে বেরিয়ে এসে শুভাশিসকে দেখে আবদারের সুরে বললো ,”এই তো বাবা এসে গেছে। ও বাবা নাগরদোলা চড়ব।”

শুভাশিস কিছু বলার আগেই সুনন্দ বললো ,”চলো। আমিও চড়বো। ”

এই অপ্রত্যাশিত আমন্ত্রণে ওরা ঘাবড়ে শুভাসিসের দিকে তাকালো। শুভাশিস চোখের ইশারায় হ্যাঁ বললো।

নাগরদোলা থেকে নেমে সুনন্দ বেজায় খুশি। এর আগে সে ওয়াটার রাইড চড়েছে কিন্তু ওসব বাংলা নাগরদোলার কাছে নস্যি।

শুভাশিস বললো ,”ওই দেখ পাঁপড় ভাজছে। খাবি?”

সুনন্দ চিৎকার করে উঠলো ,”খাবোই তো। আগে পাঁপড়। তারপর পেঁয়াজি, দেন বেগুনী ফলোড বাই জিলিপি। ”

শুভাশিস বললো এক কাজ কর। তুই আমার বাড়িতে গিয়ে বোস । আমি নিয়ে আসছি।

পাশেই দোকানে একজন ভদ্রমহিলা যে কানের দুল হাতে তুলে পঞ্চাশ টাকা দাম শুনে আবার রেখে দিল সেই শুভাশিসের স্ত্রী অন্তরা।

শুভাশিস তাকে বললো, ” সুনন্দকে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে বসো আমি আসছি।”

একতলা ছিমছাম বাড়ি শুভাশিসের । অন্তরার তৈরি চায়ে চুমুক দিয়ে সশব্দে পরিতৃপ্তির “আঃ” বলে উঠলো সুনন্দ।

-“তোর হুইস্কির থেকেও ভালো?” ঘরে ঢুকে জিগেস করলো শুভাশিস।

হাতে প্যাকেটে তেলে ভাজা আর জিলিপি। প্লেটে পড়তে সেটা নিমেষেই সাবাড় করে দিল সুনন্দ। তারপর একটা ঢেঁকুর তুলে বললো , “পার্ক স্ট্রিট শালা ফেল মেরে যাবে”

এর মধ্যে কখন এসে দাঁড়িয়েছে শুভাশিসের ছোট মেয়েটা। সে জিগেস করল , “বাবা মেলা থেকে কি এনেছ আমার জন্য?”

শুভাশিস পকেট থেকে ছোট্ট একটা বাঁশি বের করে দিলো। সেটা ফু দিলে লম্বা হয়ে যায় আর পু পু করে বাজে। সেটা পেয়ে তার কি আনন্দ । দুবার সুনন্দর দিকে বাঁশিতে ফুঁ দিলো আর বাঁশিটা সুরুৎ করে এগিয়ে গেল সুনন্দর দিকে। সেটা দেখে মেয়ের কি হাসি।

সুনন্দও হেসে ফেলল। তবে তার সাথে চোখের কোনটা ভিজেও গেল। তার সদ্য কিনে দেয়া ভিডিও গেম কনসোলটা আউট ডেটেড তকমা দিয়ে তার ছেলে ছুঁয়েও দেখেনি।

এবার বাড়ি যাবার পালা। গলির মোড় অব্দি এগিয়ে দিল শুভাশিস। এখন রাস্তাঘাট ফাঁকা। ভাঙা মেলায় দোকানিরা ফেরার তোড়জোড় করছে। গাড়ির দরজাটা খুলে ওঠার আগে সুনন্দ থমকে দাঁড়ালো। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুনন্দ জড়িয়ে ধরলো শুভাশিসকে। কান্না ভেজা গলায় বলল , “তুই যা বোনাস পেয়েছিস তাতে টাকার কোনো প্রয়োজন হয়না। আমি টার্গেট মিট করেও নিঃস্ব। মাঝে মাঝে এসে তোর বাড়িতে একটু অক্সিজেন নিয়ে যাব।”
শুভাশিস কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাকে বাধা দিয়ে সুনন্দ বলল ,”অফিসের পরিবেশটা বড্ড গুমোট হয়ে গেছে। একটু হালকা করতে হবে। কাল অনাউন্স করে দে উল্টো রথে অফিসে পাঁপড় ভাজা পার্টি। আর এবার থেকে টার্গেট মিট করলেই বোনাস। ”
শুভাশিস কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুনন্দ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
রাস্তার ধারে মাসির বাড়ি আসা রথের পাশে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল শুভাশিস।
***************************************
শান্তনু মুখার্জ্জী (জয়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *