কস্তুরী মৃগ – শান্তনু মুখার্জ্জী (জয় )

img_6001.jpgদারোগা জনার্দন জোয়ারদার লাশটা ভালো করে দেখলো । সক্কাল সক্কাল সুইসাইডের খবর। কার ভালো লাগে ? পুলিশ বলে কি বাড়ি ঘর নেই ? সবে সকালের চায়ের কাপে চুমুকটা মেরেছে অমনি ফোন। পাইকপাড়ার সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী তিলক নন্দী আত্মহত্যা করেছেন। গলায় দড়ি দিয়ে সিলিং থেকে লটকে আছেন। চাকর মাধব এসে আবিষ্কার করে।

তিলোকবাবুর বৌ তখন ঠাকুর ঘরে পুজো করছিলেন আর ছেলে পুষ্কর কলেজে যাবে বলে তৈরী হচ্ছিলো। তাঁকে রোজকার মতো গাড়ি করে অফিস নিয়ে যাবে বলে এসেছিলেন তার বিজনেস পার্টনার গৌরব ঘোষরায়।

তিলক নন্দী ঘুম থেকে উঠে যোগ বেয়াম করেন, তারপর চায়ের জন্য হাঁক পারেন। চা খেয়ে বাথরুম আর পাঁচ মিনিটে তৈরী। আজ তাঁকে সকাল থেকে কেউ দেখেনি। গৌরব এসে দরজা বন্ধ দেখে বাইরেই অপেক্ষা করছিলেন।

তিন তলার ঘরে একাই ছিলেন তিলক। ছেলে নিচের ঘরে থাকে আর একদম গ্রাউন্ড ফ্লোরে ঠাকুর ঘর. সেখানে তার স্ত্রী ছিলেন।

যা বোঝা যাচ্ছে তিনি ঘুম থেকে উঠেই আত্মহত্যা করেন। পরনে ছিল তোয়ালে আর স্যান্ডো গেঞ্জি। কিন্তু আত্মহত্যার কারন এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তিনি যে বেশ কিছুদিন ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন সেটা জানা গেলো তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে।

জনার্দন লাশটার ওপর ঝুঁকে পড়ে কিছু দেখার চেষ্টা করলো। তারপর ডেড বডির গালে নিজের গাল ঠেকালো। সব শেষে মৃতদেহের হাতটা তুলে নিজের মুখের সামনে ধরলো । জনার্দনের অনুসন্ধানের ধরনটাই অন্যরকম। কি যে বুঝলো ওই জানে। শুধু পর্যবেক্ষনের শেষে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ” এটা সুইসাইড নয়। এটা খুন ”

খুন ?
প্রায় চমকে উঠলো সবাই।
জনার্দন দারোগাও ভ্রূ কুঁচকে বললো , “খুন। . আমি নিশ্চিত”
গৌরব বললেন , ” কিন্তু তিলককে খুন করবে ?”
জনার্দন হেসে বললো , ” আপনিও করতে পারেন। পার্টনার খুন হলে তো বিজনেসে আর এক অংশীদারের লাভের ব্যাপারটা অস্বীকার করা যায় না। ”

গৌরব তীব্র প্রতিবাদ করে বললেন , ” প্রমান ছাড়া আপনি এসব উল্টো পাল্টা কথা বলতে পারেন না। আমি আপনার নামে মানহানীর মামলা করবো ”
তিলকের বৌ নীরা , হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতেই বললেন , ” গৌরব , তুমি শেষে খুন করলে ?”
জনার্দন রহস্য করে বললো , “আমি তো বলিনি উনি খুন করেছেন। আমি বলেছি খুন করার মোটিভ আর সুযোগ দুই ছিল। খুন আপনিও করতে পারেন ”
নীরা কান্না ভুলে চিৎকার করে উঠলেন , “আপনি কি পাগল ? আমি আমার স্বামীকে খুন করবো ? ”
জনার্দন বললো , “তিলক বাবুর বীমার নমিনি তো আপনি ? কত যেন পাবেন ?”
নীরা অনুনয়ের সুরে বললেন , “আজকের দিনটা অন্ততঃ রেহাই দিন। আপনার যা বলার আমি সব শুনবো। কিন্তু এখন আমি কিছু নিতে পারছিনা। ”
জনার্দন নিজের মনেই বললো , ” কিন্তু খুন তো হয়েছে। আর খুনি এখানেই আছে। আমি গন্ধ পাচ্ছি।”

এই অবধি বলে জনার্দন একটা আজব কাজ করলো।
বাড়িতে যারা ছিল সবাই কে পর পর দাঁড় করলো। তারপর সবার হাত টেনে নিজের মুখের সামনে ধরলো।
প্রথমে নীরা। তারপর তিলকের ছেলে পুষ্কর। তারপর চাকর মাধব আর সব শেষে বিজনেস পার্টনার গৌরব।
উপস্থিত অনেকের এই অনুসন্ধান পদ্ধতি দেখে হাসি পাচ্ছিলো কিন্তু এই পরিবেশে হাসা যায়না বলে সেটা দমন করে রাখছিলো।

কেউ কেউ কানাঘুসো করলো , ” দারোগা পাগল নাকি ? হাতের রেখা দেখে খুনি ধরবে ?”
জনার্দনের পর্য্যবেক্ষন শেষ হলে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো , ” খুনি ধরে ফেলেছি। এই চার জনের মধ্যেই একজন খুনি। আমি তাকে সময় দিচ্ছি সে যাতে নিজে অপরাধ স্বীকার করে। নাহলে আমি বলতে বাধ্য হব | আমি এক থেকে পাঁচ গুনব”
এই বলে জনার্দন গুনতে শুরু করলো …..এক …. দুই …. তিন ….. চার … পাঁচ
তারপর বললো , “নাঃ সেই আমাকে দিয়েই বলাবে। তাই হোক ”

এই বলে ওই চারজন সন্দেহভাজন মানুষের দিকে তাকিয়ে বললো , ” বাবা মাধব। খুনটা কেন করলে ?”
চাকর মাধব যেন এটা শোনার অপেক্ষায় প্রমাদ গুনছিল। সে জনার্দনের পায়ে আছাড় খেয়ে বললো , ” আমায় মাপ করে দেন বাবু। আমি আমার বুদ্ধিতে খুন করিনি। এই … এই গৌরব বাবু-ই আমায় দশ হাজার টাকা দিয়েছিলো খুন করার জন্যে। বলেছিলো খুন করে পালতে। পালতে আর পারলাম না বাবু। ধরা পড়ে গেলাম ”
গৌরব চিৎকার করে উঠলেন, ” মিথ্যে , মিথ্যে কথা বলছে। কি প্রমান আছে ? ”
জনার্দন বললো, ” ওর কথাটাই আপনাকে গ্রেপ্তার করার জন্য যথেষ্ট প্রমান গৌরব বাবু। আপনার বাকি কথা আদালতে বলবেন। কনস্টবল, মাধব আর গৌরব বাবুকে নিয়ে যাও |“
কনস্টবল এসে সাথে সাথে দুজনকে হাতকড়া পরিয়ে দিলো।

Additional SP সূর্য বাবু মৃত তিলক নন্দীর প্রতিবেশী।  তিনিও উপস্থিত ছিলেন।। তিনি কাণ্ডকারখানা দেখে পুরো হতবম্ভ। আর থাকতে না পেরে জিগেস করেই ফেললেন, “জনার্দন, কি করে ধরলে যে মাধব খুন করেছে”

জনার্দন একটা বিজয়ীর হাসি হেসে বললো , ” শুনুন তবে। আমি যখন লাশ পরীক্ষা করি তখন লাশের পরনে ছিল তোয়ালে আর গেঞ্জি। মাথার চুলে ছিল শ্যাম্পুর গন্ধ। অর্থাৎ তিনি চান করে বেরিয়েছিলেন। শ্যাম্পুর গন্ধটার পাশাপাশি আরেকটা তীব্র গন্ধ পাই। সেটা গালে নাক ঠেকিয়ে বুঝি যে সেটা ছিল দামি আফটার সেভের। তাই হাতটা তুলে আঙ্গুল শুঁকি। সেখানেও একই গন্ধ। অর্থাৎ তিনি চান করে আফটার সেভ মেখেছিলেন। আপনি-ই বলুন স্যার। একজন মানুষ সুইসাইড করার সময় তার যা মানসিক অবস্থা থাকে সেই অবস্থায় কি কেউ আফটার সেভ মাখে না শ্যাম্পু করে চান করে ? তখনি বুঝলাম যে এটা আত্মহত্যা নয়। খুন। খুন করে বডি ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। বাড়ির সবার সাথে আলাদা করে কথা বলতে গিয়ে আমি আফটার সেভের গন্ধটা আবার পাই। কোথা থেকে আসছে বুঝিনি। তাই সবার হাত পর্য্যবেক্ষন করার ছলে আমি আসলে গন্ধ শুঁকলাম আর তিলক বাবুর মৃত্যুর আগে মাখা দামি আফটার সেভের গন্ধটা পেলাম মাধবের আঙ্গুল থেকে। অর্থাৎ খুন সে গলা টিপে করে আর সেই সময় মাধবের হাতে ওই গন্ধটা লেগে যায়। একবার পরীক্ষা করে দেখবো গলায় আঙুলের দাগ আছে কিনা। যাই হোক. লাশ পরীক্ষা করার সময় আরেকটা জিনিস চোখে পরে। তিলক বাবু পাউডার মেখেছিলেন। সেই পাউডারের গুঁড়ো মাধবের নখের ফাঁকে লেগেছিলো। আর সন্দেহের অবকাশ ছিল না। বুঝে গেলাম মাধব-ই খুনি। মোটিভটা বুঝতে পারছিলাম না | সেটা মাধব-ই পরিষ্কার করে দিলো। সে কাজ করেছিল ভাড়াটে খুনি হয়ে। আর খুনটা করতে চেয়েছিলো গৌরব। ব্যবসার মুনাফাটা পুরোটাই নিজে আত্মসাৎ করার জন্য। তিলক ছোটোখাটো চেহারার মানুষ ছিলেন। মাধবের মতো একজন ষণ্ডা মার্ক লোকের পক্ষে ওকে মেরে টাঙিয়ে দেয়াটা এমন কিছু শক্ত নয়। প্ল্যানটা পুরো গৌরবের। ছেলে নিচে ব্যস্ত। বৌ ঠাকুর ঘরে | মাধবকে শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে গৌরব নিজে পাহারায় থাকলেন। যাতে কেউ এলে সামলে নিতে পারেন। কিন্তু কেউ আসেনি। মাধব অনায়াসে কাজ টুকু করে বেরিয়ে এলো.. কিন্তু যেটা ওরা বোঝেনি সেটা হলো যে কেসটা জনার্দন দারোগার হাতে পড়বে। যে গন্ধ শুঁকে খুনি ধরে ফেলে। ”
সূর্য বাবু হাতটা বাড়িয়ে দিলেন জনার্দনের দিকে। তারপর পিঠ চাপড়ে বললেন। ” তোমার একটা মেডেল পাওনা রইলো। আর কাল এই কেসটা সমস্ত কাগজে বড় বড় করে ছাপা হবে। তোমার কৃতিত্ব বর্ণনা করে। ”

জনার্দন গোঁফের ফাঁকে লাজুক হেসে বললো , ” এসব আবার কেন ? এতো আমার কর্তব্য স্যার ”
**************
শান্তনু মুখার্জ্জী (জয় )
#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *