চুল ———— শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

Santanu Mukherjee , Joy, Bengali Short Storiesসুধাময় বাবু মোচার ঘন্টর মধ্যে থেকে জিনিসটা তুললেন। তারপর আলোর সামনে লম্বা করে ধরলেন। হ্যাঁ ! কোনো সন্দেহ নেই। যা ভেবেছেন তাই। আজ এর একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বেন। অনেক সহ্য করেছেন। আর না। স্ত্রীর উদ্দেশ্যে হাঁক পারলেন সুধাময় মজুমদার। “ তৃপ্তি …… তৃপ্তি “

জিনিসটা আর কিছুই না। একটা সোনালী রঙের চুল। এ বাড়িতে সোনালী চুল একমাত্র তাঁর স্ত্রী তৃপ্তির। বয়েস কালে চুল পাকে কিন্তু তৃপ্তির চুলটা সোনালী হয়ে গেছে।এখন চুল ওঠা রোগে ধরেছে। সব জায়গায় তৃপ্তির চুল। খাবারও বাদ নেই।

তৃপ্তি হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন “কি ব্যাপার ? অতো চিল্লাছো কেন ?”

-“চিল্লাছো কেন ? না চিল্লাবে না ! এটা কি ?” তৃপ্তিকে ভেঙ্গিয়ে বললেন সুধাময়।

“এ বাবা ! আবার চুল পড়েছে।” লজ্জিত হয়ে বললেন তৃপ্তি। “আমি ফেলে দিচ্ছি। কি যে হচ্ছে।“

ফেলতে আর হলোনা। সুখময় বাবু খাবার ছেড়ে ততক্ষনে উঠে পড়েছেন।

তৃপ্তি দেবী আকুতি করে বললেন “উঠোনা গো। এভাবে খাবার ফেলে উঠতে নেই “

সুধাময় বাবুর বিরক্তি মাখানো জবাব এলো ,”নিকুচি করেছে খাবার। রোজ এই এক গা ঘিনঘিনে ব্যাপার। খাবারে চুল জিনিসটা আমি বরদাস্ত করতে পারিনা তুমি জানোনা ?”

তোয়ালেটা ছুঁড়ে ফেলে ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিলেন সুধাময় বাবু।

খাটের পাশে ড্রেসিং টেবিল। সেখানে একটা চিরুনি রাখা। তৃপ্তির চিরুনি। সেই চিরুনির সরু দাঁতে আষ্টে পৃষ্টে জড়িয়ে আছে এক গাছা সোনালী চুল।

-“ডিসগাস্টিং ” নিজের মনে মনেই বললেন সুধাময় বাবু। চুলগুলো যত্ন করে রেখে দেবার কি মানে তিনি বুঝতে পারলেন না। এখন থেকেই সারা ঘরে ছড়ায়। সেখান থেকে খাবারে।

এর উপায় কি করা যায় সেটা ভাবতে ভাবতেই চমকে উঠলেন একটা শব্দে। কিছু একটা পড়ার শব্দ। বেশ জোরে। আর প্রায় সাথে সাথেই শুনলেন তাঁর ছেলে ঈশান এবং তাঁর পুত্রবধূ জয়ন্তীর গলা।

ঈশান চিৎকার করছে ,”মা পড়ে গেলো।”

জয়ন্তী এসে দরজায় আঘাত করছে ,”বাবা তাড়াতাড়ি আসুন। মা কেমন করছেন ”

সুধাময় হন্তদন্ত হয়ে যতক্ষনে বেরোলেন ততক্ষনে সব শেষ। তৃপ্তির নিথর দেহটা মেঝেতে লুটিয়ে। ম্যাসিভ কার্ডিয়াক এরেস্ট। অন্ততঃ ডাক্তার গাঙ্গুলী তাই বললেন।

শ্রাদ্ধ মিটে গেলে সুধাময় ছেলেকে ডেকে বললেন ,”তোর মায়ের প্রতি অনেক অবিচার করেছি। আমার প্রায়শ্চিত্তের দরকার। ভাবছি আজ থেকে নিরামিষ খাবো ”

ঈশান অবাক হয়ে বললো ,”সে কি ? তা আবার হয় নাকি ?”

সুধাময় কিছু উত্তর দেবার আগেই জয়ন্তী বললো ,”বাবা যা চাইছে করতে দাও। ওনার মনে শান্তি আসবে। “

ঈশান ,”আচ্ছা” বলে নিজের ঘরে গেলো আর সাথে গেলো তার স্ত্রী জয়ন্তী। ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে ঈশানকে বললো ,”তোমার বুদ্ধি কবে হবে ? বুড়ো মাছ মাংস ছেড়ে দিলে সেভিংসটা হিসেবে করে দেখো। উনিও প্রায়শ্চিত্ত করে খুশি আর আমরাও কিছু টাকা বাঁচিয়ে খুশি। শোনোনা ,বুড়োর ভালোই টাকা। বৃদ্ধাশ্রমে যাবার বুদ্ধি দাও। ওখানে ওনার বয়েসী আরও লোকেদের পাবেন। সময় কেটে যাবে। “

ঈশানের বৌয়ের মুখে কথা বলার সাহস নেই। তবুও ক্ষীণ ভাবে বললো ,”মানে …. এটা বাবাকে বলব কি করে ?”

জয়ন্তী মুখে একরাশ বিরক্তি ও অবজ্ঞা এনে বললো ,”জানতাম তোমার মতো মেনিমুখোকে দিয়ে কিস্যু হবে না ”

ঈশান সত্যি বলতে পারেনি। তবে এই প্রস্তাব যে বাবার কাছ থেকেই আসবে সেটা ঈশান বুঝতে পারেনি। আর যে পরিপেক্ষিতে আসবে সেটা সে আরও বোঝেনি।

সেদিন সুধাময় বাবু খেতে বসেছেন। সবে মুগের ডালের বাটিটা উপুড় করেছেন অমনি চোখে পড়লো একটা জিনিস। বাটির নিচে কুন্ডুলি পাকানো অবস্থায় পড়ে আছে একটা সোনালী রঙের চুল। ঠিক তৃপ্তির চুলের মত।

কার চুল এটা ? এমন সোনালী রং তো তৃপ্তির চুলের ছিল। কিন্তু তৃপ্তির চুল কিভাবে আসবে ? সে তো আর নেই। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো সুধাময়ের। ঘরে গিয়ে আবার চমকে উঠলেন তিনি। খাটের ওপর পড়ে আছে একটা চুল। সোনালী লম্বা চুল। যে দিকটায় তৃপ্তি শুতো ঠিক সেখানে।

তবে কি তৃপ্তি মৃত্যুর পরেও বাড়ি ছেড়ে যায়নি ? সে কি তাঁর সুক্ষ শরীরে সমস্ত অপমানের বদলা নিতে চায় ?

সুধাময়ের কপালে ঘাম। ধপ করে তিনি বসে পড়লেন।

পর পর তিনদিন খাবারে চুল পেলেন সুধাময়। যেখানেই যান সেখানেই তিনি যে জিনিসটা অবধারিত ভাবে পান সেটা হলো সোনালী রঙের চুল।

সুধাময় মজুমদারের ভয়ে ,আতঙ্কে খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো।

পাঁচ দিনের মাথায় সুধাময় ঈশানকে ডেকে বললেন ,”তিনি এই যন্ত্রনা আর সহ্য করতে পারছেন না। এ বাড়ি ছেড়ে তিনি চলে যেতে চান।“

ছেলে বাড়ি ছাড়ার কোথায় অবাক হয়ে বোললো ,”এখন আবার বাড়ি পাবো কোথায় ?”

উত্তর যেন তৈরিই ছিল সুধাময় বাবুর। একটু চুপ করে বললেন ,”আমায় বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আয়। এ বাড়িতে তোর মা আমায় থাকতে দেবে না “

দুদিন পরে ঈশান আর জয়ন্তী সুধাময় বাবুকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এলো।

সেদিন সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে কিটি পার্টির আয়োজন করেছে জয়ন্তী। এবার বাড়িতে ওর রাজত্ব। এ যেন সেই রাজ্যাভিষেকের উৎসব।

বিকেলে পার্টির জন্য তৈরী হচ্ছিলো জয়ন্তী। ঈশান এসে একটু সংকোচে জিগেস করলো,” তুমি বিশ্বাস করো ? এ বাড়িতে মায়ের আত্মা এখনো আছে ?”

জয়ন্তী মুচকি হাসলো।

ঈশান আবার বললো ,” না জয়ন্তী। হাসির কথা নয়। বাবার খাবারে মায়ের মৃত্যুর পরেও কিভাবে চুল থাকতো ?”

জয়ন্তী কোনো কথা না বলে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা জিনিস বের করে তুলে ধরলো ঈশানের দিকে। তৃপ্তির চিরুনি। আর তাতে এখনো বেশ কিছু চুল জড়িয়ে।

জয়ন্তী কৌতুক পূর্ন দৃষ্টি দিয়ে বললো ,”তোমার মায়ের এই সম্পত্তিটি আমি ঝেড়ে ছিলাম। তুমি তো আর বাবাকে কিছু বলতে পারলেনা। তাই আমিই বুদ্ধি বের করলাম। একটা করে চুল এখন থেকে বাবার খাবারে , বিছানায় রেখে দিতাম। আর তাতেই কাজ হাসিল। “

এইটুকু বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো জয়ন্তী।

ঈশান দাঁড়িয়ে রইলো মূর্তিমান ক্যাবলার মত।

সন্ধ্যের পার্টি জমে উঠেছে। খাবারের রকমারি আইটেমের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটছে হুইস্কির ফোয়ারা।

হঠাৎ তাল কাটার মত কে একজন বলে উঠলো ,” জয়ন্তী গ্লাসটা পাল্টে দে। ভেতরে চুল পড়ে আছে। “

জয়ন্তী হাতে নিয়ে দেখলো সত্যি ভেতরে একটা সোনালী চুল।

কিভাবে এলো ? কিছুতেই ভেবে পেলোনা। ততক্ষনে আর একজন বলে উঠেছে ,”জয়ন্তী ফিশ ফ্রাই কোথা থেকে এনেছিস ? ভেতরে তো চুল। “

জয়ন্তী সেখানেও দেখলো সোনালী চুল ফিশ ফ্রাই থেকে উঁকি মারছে।

দৌড়ে গিয়ে ফ্রাইড রাইসের ঢাকা খুললো জয়ন্তী। সেখানে রাইসের ওপর চুল ভর্তি। আর সেগুলোর রং সোনালী। অতিথিরা বমি টানতে টানতে সেখান থেকে প্রস্থান করলো। যাবার আগে কিছু অম্ল মধুর কথা শুনিয়ে গেলো ওদের। জয়ন্তী লজ্জায় অপমানে লাল হয়ে গেলো। একজন বেরোবার সময় বলে গেলো ,”এত্ত নোংরা বাড়ি জানলে কোনোদিনও আসতামনা ”

জয়ন্তীর চোখ ফেটে কান্না আসছিলো। কিন্তু কোনো এক অজানা অস্বস্তিতে কাঁদতেও ভুলে গেলো। তার মুখের ভেতর কিছু একটা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। উন্মাদের মতো ছুটে গেলো আয়নার সামনে। হাঁ করতেই দেখতে পেলো এক দোলা সোনালী রঙের চুল মাকড়সার জালের মতো দাঁত থেকে জিভ পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।

দু আঙ্গুল দিয়ে টেনে বের করার চেষ্টা করলো। কিছুটা বেরোয় তো কিছুটা আটকে থাকে। শেষে প্রায় হাতের সবকটা আঙ্গুল ঢুকিয়ে সেই চুলের জট ছাড়িয়ে যখন বের করে আনলো তখন তার প্রায় শ্বাস বন্ধ হবার মত অবস্থা।

জয়ন্তী এক দৌড়ে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুললো। সেখানে চিরুনি নেই। এক ছুটে সে গেলো সুধাময়ের ঘরে। আর সেখানে যা দেখলো তাতে তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেলো।

দেয়ালে টাঙানো তৃপ্তির প্রকান্ড ছবিতে চিরুনিটা ঝুলছে। সে ছবিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। খোঁপা করা চুল এখন আর সেই অবস্থায় নেই। প্রচন্ড ঝড়ে যেন খোঁপা খুলে গিয়ে সেই সোনালী চুল এখন নৃত্যরতা। তৃপ্তির শান্ত , মমতা মাখা চোখ যেন ঘৃণা আর ক্রোধের আগুন ঝরাচ্ছে।

সভয়ে পিছিয়ে এলো জয়ন্তী। পালতে গিয়ে ধাক্কা খেলো ঈশানের সাথে।

চিৎকার করে বললো ,”ঈশান এটা কি করে হয় ? এটা কি করে হয় ?”

ঈশান বললো ,”মা আগে ছিলোনা। তবে এখন আছে। বাবাকে মা ভীষণ ভালোবাসত আর তাই বাবাকে যে তুমি ছল করে তাড়িয়ে দিয়েছো সেটা মা মেনে নিতে পারেনি। চলো বাবাকে ফিরিয়ে আনি না হলে আমরা কেউ এখানে থাকতে পারবোনা। “

পরদিন ভোরে ঈশান আর জয়ন্তী গিয়ে সুধাময়কে ফিরিয়ে আনলো। ঈশান বললো ,”মায়ের চিরুনি থেকেই চুল উড়ে বিপত্তি ঘটে ছিল। তবে আর হবে না”

সুধাময় বাবুকে নিয়ে যখন ওরা ঘরে ঢুকলো তখন বেলা হয়ে গেছে। তিনজনেই এসে দাঁড়ালো তৃপ্তি দেবীর ছবির সামনে। সেই মুখ শান্ত ও স্নিগ্ধ। পরিতৃপ্তিতে পরিপূর্ণ ! চিরুনিটা পড়ে ছিল ছবির নিচে। সেটাকে তুলে নিয়ে সুধাময় বাবু বললেন ,”এটা তোর মায়ের স্মৃতি। আমার কাছেই থাক। “

********************************************

———— শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *