অভিশপ্ত অর্গান – শান্তনু মুখার্জ্জী (জয় )

******************************************

Santanu Mukherjee, Joy, Bengali Storiesপার্ক স্ট্রিটের অকশান হাউস থেকে বেরিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেললেন শ্রী অপ্রতিম দত্তগুপ্ত। উফ আর একটু হলেই ফস্কে যাচ্ছিলো। রাধানাথ চক্কোত্তি একে বনেদী বড়লোক তাও আবার বস্তুটি নিজের ফ্যামিলির জিনিস। টান তো থাকবেই। কিন্তু শেষমেশ অপ্রতিম বাবু এমন এক দর হাঁকলেন যে রাধানাথ বাবু হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। আর জিনিসটার মালিক হয়ে গেলেন অপ্রতিম বাবু।

জিনিসটা আর কিছুই না। একটা অর্গান। দেখতে পিয়ানোর মতো কিন্তু আকারে একটু ছোট। রাধানাথ বাবুদের বাদ্য যন্ত্রের পারিবারিক ব্যবসা। এই অর্গানটি তাদেরই বানানো। খুব সম্ভবতঃ এটি তাঁর ঠাকুর্দা বিশ্বনাথ চক্কোত্তির সৃষ্টি। এটি তিনি বানিয়েছিলেন বর্ধমানের রাজা নবকুমার সামন্তের জন্য। তাঁর ছিল গান বাজনার শখ। নব কুমার নিজে একজন বিজ্ঞানী ছিলেন। এই যন্ত্রের নকশা তাঁর নিজের বানানো। বিশ্বনাথ বাবু হুবহু বানিয়েছিলেন তাঁর ফরমাস অনুযায়ী। সেই যন্ত্র কালক্রমে কটা হাত ঘুরে অকশান হাউসে এলো সেটা কেউ জানেনা। রাধানাথ বাবু যন্ত্রটিতে হলোগ্রাম দেখেই চিনতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপ্রতিম বাবুর বেমক্কা দামের পর তিনি চুপ করে যান। যাবার আগে যন্ত্রটির গায়ে ভালো করে হাত দিয়ে , দু একবার রিডগুলোয় আঙ্গুল বুলিয়ে বিদায় নেন।

অপ্রতিম বাবুর অনেকগুলো স্বভাবের মধ্যে একটি হলো অন্যের শখের জিনিস ছিনিয়ে নিয়ে এক অনাবিল আনন্দ পান। পাশের বাড়ির সদাশিব বাবু একটা শখ করে বেড়াল পুষেছিলেন। সেই বিড়ালকে মাছের লোভ দেখিয়ে নিজের বাড়ি এনে তোলেন অপ্রতিম বাবু। তারপর সদাশিব বাবুর হাজার চেষ্টাতেও যখন বেড়াল আর ফিরে গেলোনা তখন মুখটা তেতো করে বলেছিলেন ,”তাহলে আপনার কাছেই থাক। “ বেড়াল লাভের থেকে অপ্রতিম বাবুর বেশি আনন্দ হয়েছিল এটা ভেবে যে তিনি সদাশিব বাবুর একটা প্রিয় জিনিস সকৌশলে হরণ করেছেন। আজ তার মনের খুশি ভাবটা অনেকটা সেই কারণে। নিজের বাড়ির জিনিস এতদিন পরে হাতের কাছে পেয়েও হারানোর যে বেদনা তিনি রাধানাথ বাবুর মুখে দেখেছেন তার চেয়ে তৃপ্তি তিনি আর কিছুতে পেতেন কি ?

তবে এই অর্গানের ব্যাপারে একটা কথা বলতেই হয়। সেটা একদম অপাত্রে পড়েনি। অপ্রতিম বাবু নিজে একজন ভালো উচ্চাঙ্গ সংগীত গায়ক ও বোদ্ধা। মাঝে মাঝে নিশ্চয়ই ব্যবহার করবেন।

বাড়ি ফিরে অর্গানটা শোবার ঘরের পাশে মিউজিক রুমে দক্ষিণের জানলার পাশে রাখলেন। চাকর নিতাইকে এক কাপ চা দিতে বলে অর্গানটা কিছুক্ষন বাজালেন। রাগ মালকোষ। তার প্রিয় রাগ। বেশ কিছুক্ষন বাজিয়ে বুঝলেন এই আওয়াজ অন্য অর্গানে পাওয়া যেতোনা।রাধানাথ চক্কোত্তি এ জিনিসের কদর করতে পারতোনা।

আধ ঘন্টা মতো বাজিয়ে উঠে পড়লেন। আজ তাঁর মন বেশ ফুরফুরে। রাতে ডিনার করার আগে কিছু পুরোনো স্বরলিপির বই বের করে রাখলেন। কাল বাজানো যাবে।

ডিনার সেরে শুতে শুতে সাড়ে এগারোটা বেজে গেলো। ক্লান্ত ছিলেন। বালিশে মাথা ঠেকাতেই ঘুম এসে গেলো।

হঠাৎ একটা টুংটাং আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো অপ্রতিম বাবুর। কিসের শব্দ ? ঘড়িতে রাত দুটো। শব্দটা আসছে পাশের মিউজিক রুম থেকে। কিছু একটা বাজছে। চোখ কচলে উঠে বসলেন তিনি।

কান খাড়া করলেন। এখনো বাজনা বেজে চলেছে। কিন্তু কি বাজছে ? একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। অর্গান বাজছে। রাগ মালকোষ। কিন্তু এতো রাতে কে বাজাচ্ছে। অপ্রতিম বাবু বিপত্নীক। সারা বাড়িতে দুজন প্রাণী। তিনি আর চাকর নিতাই। তবে কি নিতাই ? কিন্তু সে কি করে হবে। নিতাই গানের গ জানেনা। আর যেটা বাজছে সেটা বিশুদ্ধ মালকোষ রাগ। ঠিক যেটা তিনি আজ সকালে বাজিয়েছিলেন।

শঙ্কিত হৃদয়ে অপ্রতিম বাবু বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মিউজিক রুমের দরজায়। ঘরে একটা হালকা আলো জ্বলছে। সেই আলোয় দেখলেন ঘরে কেউ নেই। অর্গানের সামনে টুল ফাঁকা। কিন্তু অর্গান বাজছে।

রাতের অন্ধকার চিরে মালকোষের অপার্থিব সুর ছড়িয়ে পড়ছে ঘরের কোণায় কোণায়। অপ্রতিম বাবুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ভাবলেন নিতাইকে চিৎকার করে ডাকবেন। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলোনা।

হঠাৎ একটা ডাকে চমকে উঠলেন তিনি। কেউ এসে দাঁড়িয়েছে তার ঠিক পিছনে। একটা চাপা গোঙানির শব্দ। ভয়ে ,উৎকণ্ঠায় প্রাণ যেন তাঁর গলার কাছে এসে গেছে। পেছনে তাকাবার সাহস নেই। এদিকে আপন মনে বেজে চলেছে অর্গান। বিশুদ্ধ মালকোষ রাগে। গোঙানির শব্দ বাড়ছে। এবার একদম ঘাড়ের কাছে।পিছনে রহস্যময় গোঙানি আর সামনে মালকোষ রাগে অর্গান। অজান্তেই তাঁর মুখ দিয়ে একটা চিৎকার বেরিয়ে এলো। দুটো হাত দিয়ে চোখ ঢেকে পিছনে ঘুরলেন আর তারপরেই পালতে গিয়ে পড়লেন গোঙানি শব্দের উৎসৱ ওপর। আর তাতেই চোখ মেলে দেখলেন সে আর কেউ না। চাকর নিতাই। তার অবস্থা আরও সঙ্গিন। দুটো বিস্ফরিত চোখ করে সে প্রাণ ভিক্ষা করছে অচেনা কোনো প্রেতের উদ্যেশ্য .

তারপর অপ্রতিম বাবুর বিশেষ কিছু মনে নেই। তবে তার জ্ঞান ফিরেছিল নিতাই এর আগে। তিনি যখন জল ছিটিয়ে নিতাইকে জাগালেন তখন ঘড়িতে ভোর চারটে। অর্গান বাজা বন্ধ হয়েছে। বাইরে ভোরের পাখিরা ডাকাডাকি শুরু করেছে। এইবার আলো ফুটবে।

সকালে চা খেতে খেতেই রাধানাথ বাবুকে ফোন করলেন অপ্রতিম বাবু।

অনেকটা এইরকম কথা হলো –

-“হ্যালো। .. ইয়ে মানে রাধানাথ বাবু। আমি অপ্রতিম দত্তগুপ্ত বলছি। কাল সারা রাত ভালো ঘুম হয়নি। একটা অপরাধ বোধ আমায় ঘিরে ধরছিল। অর্গানটা আপনাদের ফ্যামিলি-র বানানো জিনিস। ওটাতে আপনারই অধিকার। তাই আমি ঠিক করেছি অর্গানটা আমি আপনাকে গিফট করবো। প্লিজ না করবেননা। নানা। দামের কোনো প্রশ্নই নেই। আমি তো আর বেচছি না। এটা আমার আপনাকে উপহার।

কি ড্রাইভার আসেনি আজ। কাল আসবেন ? দাঁড়ান দাঁড়ান। আমি নিজে অর্গানটা আপনার বাড়ি আজ দিয়ে আসবো। বুকের বোঝাটা নামানো খুব দরকার। আমি আসছি এক ঘন্টার মধ্যে। ”

ফোন রেখে একটা মেটারোর বুক করে অর্গানটা সেটায় তুলে দিলেন। তারপর নিজে ড্রাইভারের সিটের পাশে বসার আগে নিতাইকে বললেন ,”আজই আপদ বিদায় করে আসি। ”

নিতাই নিচু গলায় বললো ,”তাই করেন বাবু। ও বাজনায় জীন আছে ”

রাধানাথ বাবুর বসার ঘরটা বেশ ছিমছাম। অর্গানটা রাখারও একটা সুন্দর জায়গা পাওয়া গেলো। রাধানাথ বাবু অপ্রতিম বাবু কে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে বললেন “একটা কথা আছে। কিছু মাইন্ড করবেন না। আপনি ওটা পয়সা দিয়ে কিনেছেন। আজ আমায় দান করছেন। পরে যদি কখনো অস্বিকার করে ফেরত চান ?”

অপ্রতিম বাবু হোহো করে হেসে উঠে বললেন ,”আচ্ছা আমি একটা দানপত্র লিখে দিচ্ছি। কেমন ? হবে তো ?”

দানপত্রে খসখস করে সই করে অপ্রতিম বাবু এবার ওঠার অনুমতি চাইলেন। অর্গানের পাশে এসে একটু দাঁড়ালেন। তারপর নিজের মনে একটু হেসে যেই দরজার দিকে ঘুরেছেন অমনি আবার কানে এলো মালকোষের সুর। চমকে ফিরে তাকালেন। অর্গান বাজছে। নিজে নিজেই। চমকে তাকালেন রাধানাথ বাবুর দিকে। তিনি মিটিমিটি হাসছেন। হাতের দানপত্রটা দেরাজে রেখে এবার হিমশীতল গলায় প্রশ্ন করলেন। কাল রাতে এই বাজনাই শুনেছিলেন না ?

অপ্রতিম বাবু ঢোক গিলে বললেন ,”হ্যাঁ মানে ….. “

কথা শেষ হলোনা। আবার রাধানাথ বাবুর প্রশ্ন। “তাই এই ভুতুড়ে অর্গানটা আমার ঘাড়ে চাপালেন অপরাধ বোধের দোহাই দিয়ে ”

অপ্রতিম বাবু উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না।

এবার রাধানাথ বাবু একটা অদ্ভুত ব্যাপার করলেন।

অর্গানের ওপরের ঢাকনার একটা অংশতে চাপ দিতেই সেটা ঢাকনা হয়ে খুলে গেলো। ভেতরে কয়েকটা বোতাম। আর একটা ঘড়ির মত জিনিস। রাধানাথ বাবু বলে চললেন। এই অর্গানটা সাধারন অর্গান নয়। এটার নাম মেমোরারগন। নামটা আমার ঠাকুরদার দেয়া। বর্ধমানের রাজা নব কুমার সামন্ত সুর করতেন। সেই সুর ধরে রাখার জন্য আমার ঠাকুরদাকে এই অর্গানের নকশা দিয়েছিলেন যেটা বাজানো সুর রেকর্ড করে রাখে আর পরে বোতাম টিপে ইচ্ছে মতো শোনা যায়। আমার ঠাকুরদা তার সাথে টাইমার যোগ করেছিলেন। অর্থাৎ ওই ঘড়িটি। কোনো বিশেষ সময়ে রেকর্ড করা সুর বাজানোর জন্য আগে থেকে সেট করা যায়। এই যন্ত্রকে আপনি মর্ডার্ন সিন্থেসিজারের আদি সংস্করণ বলতে পারেন।

অর্গানটা না থাকলেও ঠাকুরদার ডাইরি আমার কাছে যত্নে রাখা আছে। সেটা আমি পুরো পড়ি। তাই যখন আপনি অর্গানটা কিনে নিলেন আমি ওটায় হাত বলবার ছলে রেকর্ডার আর টাইমার দুটোই সেট করে দিয়েছিলাম। রেকর্ডারের জন্য ছিল ”নেক্সট মিউজিক টোন ” অর্থাৎ এর পরে যেটা বাজানো হবে সেটার রেকর্ড করার আদেশ আর সেটিকেই বাজাবার জন্য টাইমার সেট করেছিলাম রাত দুটোয়। বাকিটা আপনি জানেন। এই উপহারের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আশা করি আপনার অপরাধ বোধ কিছুটা কমেছে। “

অপ্রতিম বাবুর অবস্থা স্তম্ভিত, হতবম্ব আর ক্রুদ্ধর এক পাঁচমিশালি মিশ্রণ। উত্তেজিত হয়ে কিছু একটা বলতে যাবেন তখনি রাধানাথ বাবু হাত তুলে বলে উঠলেন ,”এবার আপনি আসুন। আমার স্নানের সময় হয়েছে।”

বাইরে বেরিয়ে অপ্রতিম বাবুর সবরকম অনুভূতি ,আবেগ ছাপিয়ে অনুশোচনা দেখা দিলো। সারা জীবন অন্যের দ্রব্য কেড়ে যে সুখ পেয়েছেন তার শিক্ষা এবং শাস্তি ভালোই পেলেন। বাড়ি ঢোকার মুখে দেখা পাশের বাড়ির সদাশিব বাবুর সাথে। তাঁকে দেখে মুচকি হেসে অপ্রতিম বাবু বললেন ,”আপনার হুলো আপনাকে বেজায় মিস করছে। আজ ওকে আপনার কাছে দিয়ে আসবো। ”

********************************************

শান্তনু মুখার্জ্জী (জয় )

#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *