স্ক্রিন টেস্ট – শান্তনু মুখার্জ্জী (জয়)

*************************************

img_5593.jpgরজত সেনগুপ্তর চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে ভালোই নাম ডাক। বেশী ছবি করেননা। বছরে একটা করে রিলিজ আর মুক্তি পাওয়া মাত্রই সুপার হিট। শরৎকালে বাংলার লক্ষ লক্ষ লোকে অপেক্ষা করে দুটো জিনিসের। এক দুগ্গা পুজো আর দুই রজত সেনগুপ্তর নতুন ছবি। ভদ্রলোক ছবি বানানো ছাড়াও মার্কেটিংটাও ভালো বোঝেন। ফেসবুকে কিভাবে মুক্তি আসন্ন ছবি নিয়ে লোকের মনে উৎসাহ সঞ্চার করতে হয় সেটা ভালোই জানেন। এবারে তাঁর নতুন গোয়েন্দা ছবি মুক্তি এবং সাফল্য পাবার পর তিনি ঘোষণা করলেন যে তাঁর পরের ছবির বিষয় হবে ভূত। গা ছমছমে ভয়ের ছবি।

সেদিন শীতের রাত। রজত বাবু সবে স্ক্রিপ্টটা শেষ করেছেন, এমন সময় বেয়ারা নকুল এসে খবর দিলো ,”এক বাবু এসেছেন দেখা করতে ”

হাতের ঘড়িটা দেখলেন রজত বাবু। রাত ৯ :২৫ বাজে। এখন কে এলো ? অনেকেই এসে সিনেমায় নামবে বলে আব্দার জানায় । এই সব উৎপাত এক্কেবারে সহ্য হয়না। অভিনয়টা লোকে যত সহজ মনে করে ততটা মোটেও সহজ নয়। এই এতো রাতে যদি কেউ অর্বাচীনের মত সিনেমায় নামার অনুরোধ নিয়ে আসে তাহলে তাঁর পক্ষে আজ মেজাজ ঠিক রাখা মুশকিল হয়ে যাবে।

এত শত ভেবেও রজতবাবু নকুলকে বললেন , “ এই ঘরে পাঠিয়ে দে। “

রজতবাবুর স্টাডিটা বেশ বড়। হালকা একটা আলো জ্বলছে। আর টেবিলের ওপর আছড়ে পড়ছে টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলো।

ল্যাপটপটা স্লিপ মোডে দিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই তিনি দেখলেন একজন আগন্তুকের প্রবেশ ঘটেছে। আগন্তুক উচ্চতায় প্রায় সাড়ে ছ ফিটের কাছাকাছি। মুখটা পাংশুটে ও লম্বা। চোখগুলো কোটর প্রবিষ্ট হলেও ভাটার মত জ্বলছে। গালে অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি গোঁফ। এতো লম্বা লোক রজতবাবু আগে দেখেননি। তবে সত্যি কি দেখেননি ? মুহূর্তের মধ্যে মনে পড়ে গেলো কলেজের সহপাঠী নির্মলকে। ঠিক এরকমই দেখতে ছিল তাকে। কলেজে ওরা ঢ্যাঙা নিমু বলে ডাকত। তাহলে কি এতদিন পর নির্মল এসেছে ? কিন্তু কেন ? কি মতলবে ? প্রমাদ গুনলেন রজতবাবু।

লোকটা পান খাওয়া লাল ছোপ পড়া দাঁতগুলো বের করে বললো “কিরে রজত। চিনতে পারছিস ?”

রজতবাবুর মুখ থেকে আপনাআপনিই বেরিয়ে এলো ”ঢ্যা মানে নির্মল ”

“যাক ! চিনতে পেরেছিস তাহলে” নির্মল হেসে বললো।

রজতবাবু এতটাই অবাক হয়েছেন যে ভদ্রতা দেখিয়ে বসতে বলতেও ভুলে গেলেন। কি কিম্ভুত কিমাকার চেহারা বানিয়েছে নির্মল !

নির্মল বলে চললো, “ একটা বিশেষ দরকারে এসেছি তোর কাছে। তুই আবার ভেবে বসিস না যে আমি টাকা চাইতে এসেছি। ”

কি আশ্চর্য্য। নির্মল কি গুনতে জানে ? ও কি করে জানলো যে রজতবাবু সত্যি ভাবছেন যে এই লোকটার আগমনের হেতু কিছু অর্থ সাহায্য পাওয়া।

রজতবাবু একটা অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে বললেন ,”নানা তা কেন ? বল কি বলবি “

নির্মল কোনো ভনিতা না করে সোজাসুজি বলে দিলো ” তোর পরের ছবিতে একটা পার্ট দিবি।

এর উত্তর যেন তৈরিই ছিল।

-“তুই কি অভিনয় জানিস ? মানে আগে কখনো কোথাও এক্টিং করেছিস ?”

– “আরে দূর ! সেরকম রোল পেলাম কই। তোর এই ভূতের চরিত্রে আমায় খুব ভালো মানাবে। তাই এলাম।

রজত বাবু এই বেয়াড়া অনুরোধে একটু অসন্তুষ্টই হলেন কিন্তু মুখে কিছু বললেন না। পুরোনো বন্ধুত্বের মর্যাদা যতটা রক্ষা করা যায় সেটুকু বজায় রেখে বললেন , “ভূতের চরিত্রটাই তো সব চেয়ে বড়। অভিনয়ের অভিজ্ঞতা না থাকলে মুশকিল। অন্য কোনো রোলে ভেবে দেখবো। তবে এখন তো হবেনা। আমি একটা স্ক্রিন টেস্টের ডেট ঠিক করে জানিয়ে দেবো। ”

নির্মল একটু ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো, “অন্য কোনো রোলে আমায় মানবেনা। ভূতের পার্টটা দে। ফাটিয়ে দেব। কথা দিচ্ছি।”

রজতবাবু হেসে বললেন, “ সবারই মনে হয় যে তারা অভিনয় করতে পারে। কিন্তু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে আর মুখ দিয়ে কথা বেরোয়না। তুই তো আগে কখনো সিনেমা করিসনি। কি করে জানলি যে তুই ফাটিয়ে দিবি?” রজতবাবুর গলায় হালকা বিদ্রুপ।

নির্মল কিন্তু সে বিদ্রুপ গায়ে মাখলোনা। বরং আলোর একটু কাছে এসে সবকটা দাঁত একসাথে বের করে বললো , “কারণ বাকিরা অভিনয় করবে আর আমায় অভিনয় করে ভেক ধরতে হবে না।”

কথাটা শুনে বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো রজতবাবুর। এর মানে কি ? যে এসেছে সেকি নির্মল না অন্য কেউ ?

উফফ কি বীভৎস চেহারা নির্মলের। দাঁতে লাল রংগুলোকি পানের ছোপ ? নাকি রক্তের দাগ ? রক্ত পান করা ড্রাকুলাদের দাঁত অনেক সময় এরকম হয়।

নির্মল এক দৃষ্টে তাকিয়ে রজতবাবুর দিকে। রজতবাবুর সম্বিৎ ফিরলো একটা ফোনের আওয়াজে। কি সব বাজে কথা ভাবছেন তিনি। নির্মল নিশ্চয়ই মিথ্যে বলছে। বজ্র কঠিন গলায় রজতবাবু বললেন ,”দ্যাখ নির্মল ! এটা মস্করা করার জায়গা নয়। নিজেকে ভূত প্রমান করতে চাইলে অন্য কারো কাছে যা। এখানে বিশেষ লাভ হবে না।” এই বলে ফোনটা ধরলেন রজতবাবু। কলেজের আরেক সহপাঠী মৃত্যুঞ্জয় রক্ষিতের ফোন।

– “হ্যালো রজত। মৃত্যুঞ্জয় বলছি ”

– “বল ”

-“ একটা বাজে খবর আছে।”

-“কি?”

-“কলেজের নির্মলকে মনে আছে ? ঢ্যাঙা নিমু ? একটু আগে গাড়ি চাপা পড়ে মারা গেছে। আমার সাথে দেখা করতে আসছিলো। একসাথে আমাদের তোর বাড়ি যাবার কথা ছিল। ও একটা সিনেমায় চান্স খুঁজছিলো। কিন্তু সব শেষ। পুলিশ এসে বডি নিয়ে গেছে। আমার ভাই শরীর খারাপ লাগছে। “

রজতবাবুর হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেলো। মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। নির্মল এখনো তাকিয়ে রজত বাবুর দিকে। আবার সেই ধরা গলায় বললো ,”প্রমান পেলি ? এবার আমায় রোলটা দে। দেখ তোর কি দারুন মার্কেটিং হবে এ ছবির। বিজ্ঞাপনে লেখা থাকবে – ভূতের চরিত্রে আসল ভূত ! কি রে জমবেনা ?”

রজত বাবুর মুখ বেঁকে গেছে। পা তুলে হাঁটু দুটো বুকের কাছে এনে ঠক ঠক করে কাঁপছেন। নির্মল রক্ত মাখা দাঁত বের করে হেসে চলেছে।

একটা ধুপ করে শব্দ হলো। রজতবাবু জ্ঞান হারালেন।

পরদিন সকালে চাকর নকুলের মুখে শুনলেন যে আওয়াজ শুনে নকুল ছুটে আসে ও তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে। চোখে জল দিতে জ্ঞান ফেরে কিন্তু কথা বলতে পারছিলেননা। সকালে অনেকটা স্বাভাবিক।

দুপুরে আরেক প্রস্থ ঘুম দিয়ে বিকেলে অনেকটা সুস্থ লাগলো তাঁর। বিকেলের চায়ে চুমুক দিতেই নকুল এসে একটা চিঠি দিয়ে গেলো। এক ভদ্রলোক সকালে এসে দিয়ে গেছেন। তখন রজতবাবু ঘুমোচ্ছিলেন তাই দেয়া হয়নি।

প্লাস পাওয়ার চশমাটা নাকের ডগায় লাগিয়ে চিঠিটা খুললেন রজত বাবু। তাতে লেখা –

ভাই রজত ,

আমি নির্মল। কালকের ঘটনার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমি জীবিত আর বহাল তবিয়তেই আছি। অনেকদিন ধরে গ্রূপ থিয়েটার করছি। সিনেমায় নামা অনেকদিনের শখ। কিন্তু আমার চেহারার উপযুক্ত রোল পাওয়া যায়না। শেষকালে যখন দেখলাম তুই ভূতের ছবি করছিস তখন ভারি লোভ হলো। তোর ব্যাপারে জনশ্রুতি শুনেছিলাম যে তুই নতুনদের সুযোগ দিসনা আর কাজ চাইতে গেলে ন্যূনতম স্ক্রিন টেস্টটুকু না নিয়েই বিদায় করিস। তাই আমার অভিনয় তোকে জোর করে দেখাবার জন্য এই প্লানটা বার করলাম। ভাবলাম এই ভাবেই স্ক্রিন টেস্টটা হয়ে যাবে। ভেবেছিলাম তোকে সব বলে দেবো কিন্তু তুই অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় আর তোর চাকর এসে যাওয়াতে আমি ভয় পালিয়ে আসি।

দুটো জায়গায় সাহায্য পেলাম। এক : আমার চেহারা আর দুই : মৃত্যুঞ্জয়। মৃত্যুঞ্জয় নাটক ভালোবাসে। আমার অভিনয়ের ভক্ত। ওকে বলতেই ও রাজি হয়ে গেলো। চোখের চশমা খুলে , নাটকের মেকআপ ম্যান সিতুদার কাছে একটু মেকআপ নিয়ে, খয়ের দিয়ে তিনটে পান খেয়ে দাঁত লাল করে তোর বাড়ি হাজির হলাম। বাকিটা তুই জানিস।

আমি এই বেয়াদপির জন্য ক্ষমা চাইছি। একটা অনুরোধ। যদি অভিনয় ভালো লেগে থাকে তাহলে একটা চান্স দিস।

পুনশ্চ : নিচে মোবাইল নাম্বার দিলাম।

ইতি

ঢ্যাঙা নিমু

রজতবাবু রুমাল দিয়ে মুখ মুছে ফোনটা হাতে নিয়ে নম্বরটা ডায়াল করলেন।

কিছুই ঘটেনি এমন ভাব দেখিয়ে বললেন , –

-“নির্মল ! পরশু নটায় চলে আসিস ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে। কন্ট্রাক্টটা সাইন করে যাস। পরের মাস থেকে শুটিং শুরু। ছবির নাম ‘মধ্যে রাতের আতঙ্ক’ । ভূতের রোলটা তোর জন্যই রইলো।”

********************************************

শান্তনু মুখার্জ্জী (জয়)

#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *