আল্হাদি – শান্তনু মুখার্জ্জী (জয়)

img_0978-1.jpgসন্তু  সদ্য নয় পেরিয়ে দশে পড়েছে। গতকাল ওর বার্থডেতে ওর বাবা ওকে একটা কুকুর ছানা উপহার দিয়েছেন। সন্তুর অনেক দিনের একটা কিছু পোষার শখ। যতবারই কিছু পোষার কথা হয়েছে ততবারই সন্তুর মা নাকচ করে দিয়েছেন। পোষ্য জিনিষটা তাঁর ঘোর অপছন্দ। ঘর নোংরা করে তাঁর কাজ বাড়বে এটা অজুহাত হলেও আসল কারণ তিনি ভয় পান। কিন্তু শেষে অনেকটা সন্তুর বাবার উৎসাহের জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতি দিয়েছেন। সন্তু স্কুলে জীব বিদ্যার ক্লাসে পড়েছে যে পোষ্য মানুষের খুব ভালো বন্ধু হতে পারে। তার তেমন কোনো বন্ধু নেই। একটা কুকুর হলে তার একটা বন্ধু হয়। এই বায়না বহুদিনের। তাই কুকুর পেয়ে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলো। এর একটা জুতসই নাম দিতে হবে। স্কুলের ফার্স্ট বয় সুকল্যানের কুকুরের নাম ফ্রস্টি। সন্তুও সেই নাম মিলিয়ে নাম রাখলো ফ্রুকটো।

এখন সন্তুর মহা আনন্দে দিন কাটে। সে জানে স্কুল থেকে ফিরলে এখন তার একজন খেলার সাথী আছে। কুকুরের পিঠে ঘোড়ার মতো ওঠা থেকে ঠান্ডা কালো নাকে নাক ঘষা এই সব তার খেলার অঙ্গ। ফ্রুকটোও এই সব অত্যাচার মেনে নেয়। দুজনের মনের ভালোই মিল হয়েছে। কিন্তু ভগবান সবাইকে সব সুখ দেননা। আর তাই এই বন্ধুত্বে হঠাৎ অসময়ে ছেদ পড়লো।

একদিন অফিস থেকে ফিরে সন্তুর বাবা অমিতাভ বাবু জানলেন তাঁর বদলি হয়ে গেছে। পনেরো দিনের মধ্যে তাঁদের কোম্পানির নেপাল ব্রাঞ্চে তাঁকে যোগ দিতে হবে। তিনি স্বপরিবারেই যাবেন কিন্তু সমস্যা হলো ফ্রুকটোকে নিয়ে। নতুন জায়গায় তাঁদের নিজেদের সব কিছু ঠিক করে নিয়ে বসবাস করতে সময় লাগবে। কুকুর থাকলে একটা উটকো ঝামেলা বাড়বে। তাই অমিতাভ বাবু স্থির করলেন ফ্রুকটোকে বিক্রি করে দেবেন। সন্তু তিন রাত্রি কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেললো। কিন্তু সময় ও পরিস্থিতির প্রয়োজনে অমিতাভবাবু বিক্রির সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। চতুর্থ দিনের মাথায় অমিতাভ বাবুর এক সহকর্মী বিজয় বিশ্বাস কুকুরটি কিনে নিলেন পাঁচ হাজার টাকায়। যাবার সময় কুকুরের চোখে জল দেখে সন্তুর মা সুনন্দা দেবীও চোখের জল ধরে রাখতে পারলেননা।

নেপাল পৌঁছে যে বাড়িটায় ওঁরা উঠলেন সেটা বেশ পুরোনো। কিন্তু খাসা জায়গায়। কাঠমাণ্ড শহরের প্রাণ কেন্দ্র দরবার স্কোয়ার সামনেই। সন্তু সেখানেও একটা পোষ্য জোগাড় করার তালে ছিল কিন্তু সুনন্দা দেবী কঠোর আপত্তি জানালেন। মায়া বড় ভীষণ জিনিস। যাকে পছন্দ করতেন না তার ওপরেই এতো মায়া পড়ে গেছিলো যে এখনো ফ্রুকটোর কথা ভাবলে মনটা হুহু করে ওঠে। ওই ফাঁদে তিনি আর পা দেবেননা।

এদিকে সন্তুর বন্ধুর অভাবে এক্কেবারে ভালো লাগছেনা। সময় যেন কাটতেই চায়না।

সেদিন সন্তু নিজের ঘরে বসে ছিল। পুরোনো বাড়ি। অনেক জায়গায় ফাঁক ফোকর আছে। তেমনি একটা দেয়ালের ফাঁকে চোখ যেতে সন্তু দেখলো অনেক গুলো কালো রঙের ডেও পিঁপড়ে সার বেঁধে কোথাও চলেছে। সন্তু জানে এই পিঁপড়ে গুলো কামড়ালে খুব জ্বালা করে। তবুও ওর জীব জগতের ওপর কৌতূহল ওকে টেনে নিয়ে গেলো ওই দেয়ালের দিকে। ছুঁচলো মুখওয়ালা পিঁপড়ে গুলোর মোটা মোটা পেট। নীচটা লাল রঙের। ওরা সার বেঁধে চলেছে সন্তুর পড়ার টেবিলের পেছন দিকে। ওখানে উঁকি দিতেই ও কারণটা বুঝলো। একটা বাতাসা পড়ে আছে। সেখানেই পিকনিক করতে জড়ো হয়েছে পিঁপড়ের দল। যারা ফিরে আসছে তাদের মুখে বাতাসার ভাঙা টুকরো। ফেরার সময় খাদ্য সন্ধানে যাত্রী পিঁপড়ের মুখে মুখ ঠেকিয়ে ফিরতি পথের পিঁপড়েরা কিছু বলে দিচ্ছে। এটা বেশ মজার লাগলো সন্তুর। ভীষণ শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রাণী। সবাই লাইন করে যাচ্ছে। যেমন করে সন্তুরা স্কুলে পিটি করতে যায়। কয়েকটা দুষ্টু ছেলে মাখে মাঝে লাইন ভাঙে বকা খায়। কিন্তু পিঁপড়েদের দেখো। কেমন টানা লাইন ধরে চলেছে। একদম সামনে যে পিঁপড়েটা, সেটা একটু হেলতে দুলতে চলেছে। বাকিরা তাকে অনুসরণ করছে। সন্তু জানে ওকে বলে “রানী পিঁপড়ে। “ সেই দলনেত্রী । হঠাৎ সন্তুর মনে হলো পিঁপড়েটার একটা নাম দিলে কেমন হয়। কুকুরের নাম হতে পারলে পিঁপড়েরই বা হবে না কেন ? একটু ভেবেই তার একটা নাম মনে পড়ে গেলো। পিঁপড়েটা যেটা হেলতে দুলতে যাচ্ছে সেটা বেজায় সুখী। ওর নাম আল্হাদি দিলে কেমন হয় ? “খুব ভালো হবে।” নিজেকেই বললো সন্তু। ভারী সুন্দর নাম। কিছু না পেলে সে পিঁপড়েই পুষবে। সে-ই বিশ্বে প্রথম হবে যে পিঁপড়ে পুষবে। ব্যাপারটার মধ্যে একটা রোমাঞ্চ আছে। ব্যাস। আর কোনো কথা নয়। আজ থেকে আল্হাদিই সন্তুর‘পেট এন্ট’ | পোষা পিঁপড়ে। ব্যাপারটা সন্তু ওর বাবাকে বলতে তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। সন্তুর মা ছেলের এই পাগলামিতে বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন ,”একদম এসব বোকামো করবেনা। কোন গর্তটায় আছে দেখা। কালকেই কেরোসিন দেবো।”

সন্তু তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বললো “খবদ্দার। আল্হাদির কেউ কোনো ক্ষতি করবে না “

অমিতাভ বাবু মৃদু হেসে বললেন ,”আচ্ছা আচ্ছা। পিঁপড়েই পুষিস। ”

পরদিন সন্তু ওই গর্তের সামনে গিয়ে কিছুক্ষন ,”আল্হাদি ! আল্হাদি ! “ বলে ডাকলো। কেউ এলোনা। এতো আর ফ্রুকটো নয় যে ডাকলেই লেজ নাড়িয়ে এসে কুঁই কুঁই শব্দ করে পায়ে লুটিয়ে পড়বে। ভারি রাগ হলো সন্তুর।

হঠাৎ সন্তুর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। ওরা আগের বার বেরিয়েছিল একটা বাতাসার লোভে। তাই আল্হাদি ও তার দলকে বের করতে চাই একটা টোপ। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। খানিকটা চিনি এনে সন্তু গর্তের সামনে ঢিপি করে অপেক্ষা করতে লাগলো। প্রায় আধ ঘন্টা পর হেলতে দুলতে একটা পিঁপড়ে বেড়িয়ে এলো।

“আল্হাদি ” চিৎকার করে উঠলো সন্তু। তার পরীক্ষা সফল। তবে সে স্থির করলো যে এই ঘটনাটা কাউকে বলবেনা|

এরপর থেকে প্রায় রোজই চলতে লাগলো সন্তু আর আল্হাদি ওরফে পিঁপড়ের রানীর দৈনিন্দিন নিয়ম মাফিক সাক্ষাৎকার। প্রতিদিন একটু করে চিনি বরাদ্দ। সন্তু একদিন বাটি করে জল দিয়েছিলো কিন্তু পিঁপড়ে বাটি থেকে জল খায়না।

একদিন বিকেলে সন্তু দরবার স্কয়ারে বেড়াতে গেছে বাবার সাথে। অমিতাভ বাবু ভুলে গেছেন সন্তুর পিঁপড়ে পোষার ব্যাপারটা। মনের ভুলে বলে ফেললেন যে এখন বাইরে থাকাই ভালো কারণ বাড়িতে পিঁপড়ের মারাত্মক উপদ্রব হয়েছে আর আজ সন্তুর মা নাকি পেস্ট কন্ট্রোল করবেন। সন্তু শুনে দিকবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করলো। অমিতাভ বাবু দৌড়ে এসে সন্তুকে ধরা মাত্রই সে চিৎকার করে উঠলো ,”আমায় শিগগিরি বাড়ি নিয়ে চলো। মা আল্হাদিকে মেরে ফেলবে।”

বাড়ি পৌঁছে সন্তু দেখলো একটা পিচকিরিতে কেরোসিন ভরে সুনন্দা দেবী সবে স্প্রে করতে যাচ্ছেন। সন্তুর চিৎকারে থমকে গেলেন আর ছেলের জেদের কাছে হার মানতে হলো। পিচকিরিটা ফেলে তিনি বললেন ,”এই পিঁপড়ে একদিন আমাদের বাড়ি ছাড়া করবে এই বলে দিলাম ।“

সন্তুর এই পিঁপড়ে প্রীতি ক্রমে ক্রমে তার মায়ের অসহ্য হয়ে উঠতে লাগলো। সারাদিন সন্তু “আল্হাদি আল্হাদি” করে ডাকে। অমিতাভ বাবুকে একদিন সুনন্দা দেবী বলেই দিলেন ,” সন্তু যেটা করছে সেটা সুস্থতার লক্ষণ নয়। ওকে যে ভাবেই হোক এখান থেকে বের করে আনতে হবে। ”

পরদিন দুজনে ঠিক করলেন যে পরের রবিবার পেস্ট কন্ট্রোলে খবর দেবেন আর তার আগে সন্তুকে নিয়ে ওর মা কোলকাতায় আসবেন। সেই ফাঁকে অমিতাভ বাবু পিঁপড়ে নিধন করবেন। এটাই এক মাত্র উপায়।

দিনটা ছিল শনিবার। ২৫শে এপ্রিল। রাতের ফ্লাইটে কোলকাতায় আসবে সন্তু তার মায়ের সাথে। তার মন খুব খারাপ। আল্হাদিকে সে দেখতে পাবেনা। বার বার সে অমিতাভ বাবুকে বলে চলেছে যে তিনি যেন আল্হাদি আর বাকি পিঁপড়েদের মনে করে চিনি খেতে দেন।

সুনন্দা দেবী বাক্স গোছাচ্ছেন মাটিতে বসে। সকাল ১১টা। হঠাৎ দেখলেন ওই গর্ত থেকে সার বেঁধে বেরিয়ে আসছে পিঁপড়ের দল। এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। বুঝলেন আবার কোথাও খাবার সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু একি ? আজ তারা আর শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে এক সরল রেখায় নেই। বরং এদিক ওদিক ছুটছে। আর একটা দুটো নয়। ওই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে শয়ে শয়ে পিঁপড়ে। এক লাফে খাটের ওপর উঠে পড়লেন তিনি। দেয়ালের গর্ত থেকে অনর্গল নির্গত হচ্ছে কালো মোটা মোটা পিঁপড়ে। এতো পিঁপড়ে একসাথে কখনো দেখেননি তিনি। দেখতে দেখতে ঘরের মেঝে ভর্তি হয়ে গেলো পিঁপড়েতে। এবার খাট বেয়ে উঠবে। ভয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি। পাশের ঘর থেকে দৌড়ে এলেন অমিতাভ বাবু আর সন্তু। অমিতাভ বাবু এই দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে হতবম্ভ। কেবল সন্তু ওই পিঁপড়ের জঙ্গলে তার আল্হাদিকে খুঁজছে। .পিঁপড়েতে এখন ঘর ভরে গেছে। এবার বাইরে ভর্তি হবার পালা। কারণ পিঁপড়ে বেরোনো বন্ধ হচ্ছেনা। তার সাথে যোগ হয়েছে তাদের চাঞ্চল্য। এই তান্ডবের মাঝে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে সুনন্দা দেবী।অমিতাভ বাবু নিজের গামবুটটা খাটে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন ,”এটা পড়ে নেমে এসো ”গামবুট পায়ে গলিয়ে ঘরের বাইরে এসে সুনন্দা দেবী দেখলেন ঘরে আর মেঝে দেখা যাচ্ছেনা। সেটা পিঁপড়ের চাদরে ঢাকা। এবার তারা অস্থির পায়ে ঘর পেরিয়ে বাইরে আসতে শুরু করলো।আর কোনো উপায় নেই। অমিতাভ বাবু সন্তুকে কোলে নিয়ে সুনন্দা দেবীকে এক হাতে ধরে মারলেন হ্যাঁচকা টান আর তারপর পিপীলিকা আক্রমণ থেকে বাঁচতে সোজা সিঁড়ি টপকে রাস্তায়।এগারোটা পঁচিশ | হঠাৎ অমিতাভ বাবুর মনে হলো মাথাটা ঘুরে গেলো। কি হলো বোঝার আগেই দেখলেন সুনন্দা দেবী মাটিতে পড়ে। তিনি নিজেও যেন টাল রাখতে পারছেননা। একটা বিকট শব্দ। দরবার স্কয়ারের গম্বুজ মাটিতে পড়ে গেছে। সব দুলছে। ভূমিকম্প। এক নিমেষে চোখের সামনে বাড়িটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো। এই বাড়ি থেকেই দু মিনিট আগে বেড়িয়েছেন তিনজন। ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষের চিৎকারে চারদিক ভরে গেলো। যারা বাড়িতে ছিলেন কেউ বেঁচে নেই। অথচ তাঁরা বেঁচে আছেন অদ্ভুত দৈব বলে। কয়েক সেকেন্ডের ঝাঁকুনিতে কাঠমান্ডু শহরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলো। মৃতের সংখ্যা নিশ্চয়ই কয়েক হাজার হবে।সন্তুর চকিতে মনে পড়ে গেলো জীব বিদ্যার ক্লাসে পান্নালাল বাবু শিখিয়েছিলেন ভূমিকম্পর আগাম পূর্বাভাস মানুষ না পেলেও প্রাণীরা পায়। আর সব চেয়ে বেশী আর সবার আগে পায় পিঁপড়েরা। জার্মানি দেশে এই নিয়ে অনেক গবেষণা চলছে।সে কেঁদে বলে উঠলো, “ মা আল্হাদিকে দেখো। ওই আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছে। ওরা ভূমিকম্প বুঝতে পারে মা। একবার চলো। কয়েকজন এখনো বেঁচে থাকতে পারে।”ততক্ষনে তান্ডব থেমেছে। বাবার হাত ধরে এগিয়ে গেলো সন্তু। একটা সবুজ রঙের দেয়ালের চাঙড় ভেঙে পড়ে আছে। ওটাই সন্তুর ঘরের দেয়াল। সেটা চিনতে ওর কোনো অসুবিধা হলোনা। সন্তু নীচু হয়ে দেখলো আর তারপর ডুকরে কেঁদে উঠলো।ভীত ,সন্ত্রস্ত অমিতাভ বাবু নীচু হয়ে দেখলেন সবুজ রঙের চাঙড়ের নীচে পিষ্ট মরে পড়ে আছে শয়ে শয়ে কালো পিঁপড়ের দল।তিনি জানেন ওরই মধ্যে একটির নাম আল্হাদি।*****************************শান্তনু মুখার্জ্জী (জয়)#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *