নন্দিনী – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

**************************************

Santanu Mukhkhopadhyaya , Joy স্বামী স্ত্রী একই পেশায় থাকলে কি হতে পারে সেটা পরিচালক হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় সুন্দর করে দেখিয়ে গেছেন তাঁর ‘অভিমান ’ ছবিতে। সে ছবি দেখেনি এমন লোক হাতে গোনা। তবু এতো জেনেও উঠতি গায়িকা নন্দিনীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলো প্রতিষ্ঠিত গায়ক শোভন সেনগুপ্ত। নন্দিনী বরাবরই শোভনের গানের ভক্ত আর তাই সেও সহজেই রাজি হয়ে গেলো। ধুমধাম করে বিয়ে হলো শোভন আর নন্দিনীর। শোভনের সাথে বিয়ে হবার ফলে নন্দিনীর পরিচিতি আর একটু বাড়লো আর তার সাথে আরেকটু নামডাকও হলো। শোভনের বরাবরই নন্দিনীর গানের ব্যাপারে প্রচুর উৎসাহ ছিল আর তাই বাড়িতে ওস্তাদ রেখে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম দেয়া থেকে শুরু করে নন্দিনীর জন্য সঙ্গীত পরিচালকদের সুপারিশ সে সবই করলো। তার ফলও সে পেলো। নন্দিনী পরপর তিনটে ছবি সই করলো।

ছবি বেরোতেই গান সুপারহিট। শোভনের সাথে তার ডুয়েট ,”ওগো তুমি আমার জীবন জুড়ে…… ভরে দিলে গান হৃদয়ের সুরে সুরে ” বাজার কাঁপিয়ে দিলো। কিন্তু শোভনের সোলো গান “ ময়না আমার গায়নারে গান……লুকিয়ে সে রয় বনে “ অসাধারণ কথা ও সুর থাকা সত্ত্বেও হিট করলোনা। এই গানের ওপর প্রোডিউসার বাজি ধরেছিলেন আর তাঁকে নিরাশ হতে হলো। এমন সময় ছবির পরিচালক বুদ্ধি দিলেন গানটা রিটেক করে ছবিটা আবার রিলিজ করতে। তবে এবার শোভনের জায়গায় গাইবে নন্দিনী। প্রোডিউসারের বুদ্ধিটা মনে ধরলো। কিন্তু নন্দিনী কিছুতেই রাজি নয়। শেষে শোভনের পীড়াপীড়িতে সে গাইতে রাজি হলো।

ছবি আবার মুক্তি পেলো ফিমেল ভয়েসে গানটা দিয়ে আর বলা বাহুল্য সে গান সাথে সাথেই জনপ্রয়িতা পেলো। নন্দিনীর মাথায় ‘অভিমান ’ ছবি ঘুরছে। তার এতো জনপ্রিয়তায় এবার একটু ভয় লাগতে শুরু করলো। তার সব কিছু ভেসে যাবেনা তো ? সে এসে দাঁড়ালো শোভনের সামনে। শোভন কিন্তু বেজায় খুশি। নন্দিনীর দু হাত সে শক্ত করে ধরে বললো ,”কংগ্রাচুলেশন্স ! আমি জানতাম তুমি পারবে”

এর মধ্যে শহরে বিরাট জলসা। প্রচুর শিল্পী গাইবে। শোভন জানালো সে গাইবেনা। তার জায়গায় নন্দিনী গাইবে। নন্দিনী ভয়ে কাঁটা হয়ে রইলো। এতো বড় জলসায় সে আগে কখনো গায়নি। শোভন নন্দিনীকে দু হাত দিয়ে ধরে বললো ,”ভয় কি ? আমি তো আছি।”

নন্দিনীর তবু ভয়। দিন রাত এক করে রেওয়াজ করতে লাগলো। নিজের চেয়ে তার শোভনের সম্মানের চিন্তা বেশী। দিনে দিনে সে যেন অসুস্থ হয়ে যেতে লাগলো। পনেরো দিনের মধ্যেই চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে। বার বার মনে হচ্ছে এ প্রস্তাবে রাজি না হলেই হতো। শোভনকে সরিয়ে সে কি করে গাইবে ?

অনুষ্ঠানের যখন আর এক সপ্তাহ বাকি তখনই ঘটনাটা ঘটলো।

উদ্যোক্তাদের মাথায় বাজ পড়লো। হঠাৎ খবর এলো নন্দিনী মারা গেছে। সম্ভবতঃ অতিরিক্ত চাপ থেকে অবসাদ আর তার থেকেই আত্মহত্যা করেছে সে। শোভন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বার বার বলছে ,”আমি তো কখনো জোর করিনি। ও কেন এই চাপ নিতে গেলো ?”

অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা ফুল নিয়ে দেখা করতে গিয়ে শোভনকে প্রস্তাবটা দিলো।

-“শোভনদা , বৌদি তো আর ফিরবেনা। আমি বলিকি বৌদির স্লটে তুমিই গান গেয়ে দাও। বিশ্বাস করো ! বৌদির আত্মা শান্তি পাবে।”

শোভন একটা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো ,”দেখা যাবে।”

অনুষ্ঠানের দিন সকালে শোভন ফোন করে জানিয়ে দিলো যে ,”সে রাজি।”

যথা সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো নন্দিনীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। মঞ্চে নন্দিনীর ছবি রাখা। শোভন গান গাইতে উঠেছে। নন্দিনীকে নিয়ে দু লাইন বলতে গিয়ে চোখে জল চলে এলো। কোনোক্রমে সে নিজেকে সামলে শুরু করলো গান। সেই গান যা সে গাইতে হিট করেনি কিন্তু নন্দিনী গাইতে জনপ্রিয় হয়েছিল।

“ ময়না আমার গায়নারে গান……লুকিয়ে সে রয় বনে“

কিন্তু একি ? এটা কার গলা ? শোভনের অমন গুরু গম্ভীর গলা কোথায় গেলো ?তার জায়গায় বেরিয়ে আসছে মিহি নারী কণ্ঠের সুরেলা গান। এযে নন্দিনীর গলা ! এ কি করে সম্ভব ? শোভন গান বন্ধ করে দুবার গলা ঝেড়ে জল খেয়ে নিলো। আবার সে গান শুরু করলো। কিন্তু আবার সেই এক মহিলা কন্ঠ। নন্দিনী গান গাইছে আর শোভন যেন ঠোঁট মেলাচ্ছে। শোভনের সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে যাচ্ছে। এবার অনেক চেষ্টা করেও সে গান বন্ধ করতে পারছেনা। কেউ তাকে জোর করে নারী কণ্ঠে গান গাওয়াচ্ছে। তার গলায় চাপ পড়ছে। কণ্ঠ নালী আটকে আসছে কিন্তু গান সে বন্ধ করতে পারছেনা।

দর্শক আসনে চাপা গুঞ্জন। কি হচ্ছে কেউ কি বুঝতে পারছেনা। উদ্যোক্তারাও হতবাক। শোভন এক ঝটকায় হারমোনিয়াম সরিয়ে দিলো। সামনে থেকে মাইক ফেলে দিলো তবুও সারা প্রেক্ষাগৃহ রমরম করছে নন্দিনীর গানে আর তার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে শোভনের ঠোঁট মেলানো। গানটা যে শোভনের গলা থেকে আসছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। শোভন যে পারছেনা সেটাও পরিষ্কার। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে |

হঠাৎ শোভন আছড়ে পড়লো নন্দিনীরছবির সামনে। গান থেমেছে। কিন্তু মুখ দিয়ে রক্ত আসছে। নন্দিনী যেন একদৃষ্টে শোভনের দিকে তাকিয়ে হাসছে।

এর মধ্যে আরেকটা শোরগোল শোনা গেলো। পুলিশ। ইন্সপেক্টর দত্ত এগিয়ে এলেন মঞ্চের দিকে শোভন তার দিকে নিজে থেকেই এগিয়ে এসে দু হাত বাড়িয়ে দিলো। হাতে হাতকড়া পরিয়ে ইন্সপেক্টর দত্ত বললেন ,”আপনার স্ত্রী নন্দিনীকে খুন করার জন্য আপনাকে গ্রেপ্তার করছি। প্রমাণ সবই উদ্ধার করেছি। আপনার দিনের পর দিন নন্দিনীর ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের কথা লিখে নন্দিনী মারা যাবার দু দিন আগে তার বাবাকে একটা চিঠি পাঠান। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সেই চিঠি সাত দিন পর পৌঁছয়। তখন নন্দিনীকে অলরেডি মৃত। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই আমরা অনুসন্ধান চালাই ও প্রমাণ জোগাড় করি। যে বিষে নন্দিনীর মৃত্যু হয়েছে তার শিশি আপনাদের বাড়ির পেছন থেকে আমরা পাই আর তাতে আপনার আঙুলের ছাপ স্পষ্ট। আপনার যদি কিছু বলার থাকে তো থানায় গিয়ে বলবেন।“

শোভন প্রায় ধুঁকতে ধুঁকতে বললো ,”কিচ্ছুর দরকার নেই। আমি সব স্বীকার করছি। ওর জনপ্রিয়তা আমায় ছাপিয়ে যাচ্ছিলো। সেটা সহ্য করতে না পেরেই বিষ খাইয়ে খুন করেছিলাম। আজ নন্দিনী আমায় পাপের শাস্তি নিজের হাতে দিয়ে গেলো।আপনি আমায় নিয়ে চলুন ইন্সপেক্টর। ও বাড়িতে আমি আর ফিরবোনা। আমি ঠিক জানি ওখানে নন্দিনী আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। আমি গেলে ও আমায় মেরে ফেলবে। ঠিক মেরে ফেলবে। আমি বাড়ি যাবোনা। কিছুতেই যাবোনা।” এই অবধি বলে কান্নায় ভেঙে পড়লো শোভন।

পুলিশ শোভনকে নিয়ে প্রিজিন ভ্যানে তুললো।

হল ভর্তি লোক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো।

যেটা ঘটলো সেটা দুঃস্বপ্নের চেয়ে কিছু কম না।

**************************************

শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *