দাঙ্গাবাজ – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

*****************************************

Santanu Mukherjee (Joy)

বর্ধমান জেলার অন্তর্গত শিল্পাঞ্চল উপনগরী আসানসোলের অদূরে বিনাপুর গ্রাম। গ্রামটি হিন্দু প্রধান হলেও অন্যান্য পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের থেকে মুসলমানের সংখ্যা এই গ্রামে বেশি। এমন শান্তিপূর্ণ দুই ধর্মের সহবস্থান আজকের এই অস্থির যুগে এক দৃষ্টান্ত। কিন্তু বর্তমানে কিছু স্বার্থলোভী ,লোলুপ প্রভাবশালী মানুষের প্ররোচনায় সেই গ্রাম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিধস্ত। আগের দিন যে হিন্দু ছেলেটি তার মুসলমান বন্ধুটির সাথে চন্ডীমন্ডপে বসে আড্ডা দিয়েছিলো পরেরদিন সেই মুসলমান বন্ধুর হাতেই সে খুন হলো।

যে মুসলমান বৃদ্ধ গ্রামের ইস্কুলে পরম যত্নে জাত ধর্ম নির্বিশেষে ছাত্র গড়তেন তিনি খুন হলেন তাঁরই এক হিন্দু ছাত্রর তরোয়ালের ঘায়ে। তবে এ খবর সেখানেই চাপা রইলো। কিছু বিক্ষিপ্ত খবর কলকাতা বা এদিক ওদিক পৌঁছলেও অধিকাংশ খবর চাপা পড়ে রইলো কয়লা খনির অন্ধকারে।

সেদিন অনেক রাতে দিগম্বর আর পীতাম্বর দুই ভাই বেরোলো মুসলমান নিধন যজ্ঞে। উগ্র হিন্দুবাদী বলে তাদের গ্রামে কিছুটা নাম আর কিছুটা বদনাম আছে।

গ্রামের উত্তরদিকে একটা ভাঙা মন্দির আছে। শিব মন্দির। ওরা ঠিক করলো ওখানে আগে অস্ত্র পুজো করে ওরা ওদের কাজে যাবে।

অনেক রাতে ওরা মন্দিরে পৌঁছে দেখলো পূজারী শোবার আয়োজন করছেন।ওরা পূজারীকে একটা পাঁচশো টাকার নোট দিয়ে বললো ,”ঠাকুর মশাই সাবধানে থাকবেন। বাইরের অবস্থা ভালো নয়। আমরা মোকাবিলায় বেরোচ্ছি। এই অস্ত্র গুলো একটু ভোলে বাবার পায়ে ছুঁইয়ে দিন। ”

পুরোহিত বিনা বাক্যব্যায়ে অস্ত্র গুলো নিয়ে শিবমূর্তির পায়ের কাছে রাখলেন।

তারপর দিগম্বর আর পীতাম্বরকে বললেন ,”পুজোর আগে একটা ব্রতকথা পাঠ করবো সেটা শুনে নাও। পুন্য অর্জন করবে। ”

দুজন ভাবলো এই রাতে বিশেষ কিছু করার নেই। তাই একটু পুণ্য অর্জনই নয় করা যাক। তাতে ঈশ্বরের কৃপায় কালকের কাজ সুসম্পন্ন হবে। গ্রামে হিন্দুদের প্রতিপত্তি আরও বাড়বে মুসলমানের সংখ্যা হ্রাসের মাধ্যমে।

দুই ভাই হাতে ফুল নিয়ে বসল। পুরোহিত হাতে একটা বই নিয়ে বললেন, “মন দিয়ে শোনো। এ ব্রতকথাই এই মন্দিরের ইতিহাস।”

ঠাকুর মশাই শুরু করলেন –

~~~~~~~~~~~~~~~~~~

অতঃপর শিব পার্বতীকে ডাকিয়া অসহায় ভাবে কহিলেন ,”শিবরাত্রির নামে এ তান্ডব তো আর সহ্য হয়না। মাথায় ক্রমাগত জল আর দুধ পড়ে পড়ে সর্দিজ্বরের উপক্রম হলো। স্নানে আমার কোনো রুচি নেই। আমি তৃষ্ণার্ত। পিপাসা নিবারণ না হলে তো আর পারিনা। “

পার্বতী বলিল ,”প্রভু আমি আপনার পানীয় জল এখুনি এনে দিচ্ছি অলকানন্দা থেকে। সেই সুমিষ্ট জল পান করে আপনি তৃষ্ণা মেটান। ”

শিব বলিলেন, “ না পার্বতী। আজ মর্তে ভক্তের হাতের পানীয় না পেলে আমার তৃষ্ণা মিটবেনা। ওই দেখো আবার মাথায় বেলের বাড়ি পড়লো। পচা আকন্দের গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত। জল না পেলে আমি এবার জ্ঞান হারাবো।”

পার্বতী নন্দী এবং ভৃঙ্গিকে ডাকিয়া কহিলেন ,”তোরা মর্তে গিয়ে একটু দেখ। তোর বাবা তো আর পারছেননা”

নন্দী ভৃঙ্গী এসে উপস্থিত হইলো একটি শিব মন্দিরের সম্মুখে। জনস্রোত বয়ে যাইতেছে। মনুষ্য ধারনের আর স্থান নেই। ভৃঙ্গীর উদরে এক ভক্তর হস্তের আঘাত লাগিতে ভৃঙ্গী চিৎকার করিয়া উঠিল। ভিড়ের মধ্যে কে যেন বলিল ,”সাধুবাবা পরে আসবেন। লেগে গেলে তখন কিছু বলবেননা।”

ইতি মধ্যে মন্দিরের পাশে গোল শোনা যাইল । হৈ হৈ রব। জমিদার গিন্নির বয়ে আনা দুধের ঘটি হারাইয়া গিয়াছে। তিনি উচ্চ স্বরে বিলাপ করিতেছেন। পাইক পেয়াদা ছুটিলো এবং অচিরেই একটি শিশুকে আনিয়া হাজির করিল যার হাতে একটি শূন্য ঘটি আর মুখে সদ্য পান করা দুগ্ধের দাগ।

জমিদার গিন্নি ক্রোধে মত্ত হইয়া চিৎকার করিলেন,”আমার আনা দুধ তুই খেয়েছিস ?

শিশুটি নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল।

জমিদার গিন্নি সরোষে প্রশ্ন করিলেন, “কি নাম তোর ? কোথায় থাকিস ?”

শিশুটি এবার উত্তর করিলো। “আজ্ঞে রহিম আলী | মন্দিরের পেছনে যে আম বাগানটা আছে তার শেষে পুকুরের ডান ধরে আমার ঘর। “

জমিদার গিন্নি হুঙ্কার ছাড়িলেন ,” কে একে মন্দিরে ঢুকতে দিয়েছে?”

সকলে একে ওপরের পানে চাহিলো।

জমিদার গিন্নি রক্তিম নয়ন বিস্ফরিত করিয়া কহিলেন, “কথা কানে যাচ্ছে না ! এই পেয়াদা একে বাঁধ গাছের সাথে আর লাগা ১০০ ঘা বেত। “

রহিম কাঁদিয়া কহিলো ,”পায়ে পড়ি গিন্নি মা। বড়ো তেষ্টা নেগেছিলো গো। ঘটিটা দাওয়াতে পড়ে দুধ গড়িয়ে যাচ্ছিলো। আমি তুলে তলাটুকু খেইছি। বিশ্বাস……. “

কথা শেষ করিতে পারিলোনা রহিম। গিন্নি মায়ের সপাটে চড় আসিয়া পড়িয়াছে তার কপোলের উপর। তাহার গালে পঞ্চ অঙ্গুলির স্পষ্ট রেখা দেখা যাইতেছে।

রহিম কাঁদিতে কাঁদিতে প্রস্থান করিলো। একটি চড়ের বিনিময়ে বেতের হাত হইতে সে বাঁচিলো।

ততক্ষনে আর এক ঘটি দুধ আনিয়া উপস্থিত হইয়াছে একটি পেয়াদা। সেই দুধ হাতে লইয়া রহিম আলীর পান করা দুধের পাত্র পদাঘাতে মন্দির প্রাঙ্গনের বাহিরে ফেলিয়া জমিদার গিন্নি মূল গর্ভ গৃহে প্রবেশ করিলেন।

শিব মূর্তির সামনে দন্ডায়মান হইয়া , ভক্তিভরে প্রণাম করিয়া ঘটের দুগ্দ্ধ ঢালিবার উপক্রম করিতে গিয়া চমকিয়া উঠিলেন। শ্বেত শুভ্র মহাদেবের ওষ্ঠে দুধের দাগ আর গালে পাঁচ আঙুলের আঘাতের চিহ্ন। জমিদার গিন্নির হাত হইতে ঘটি খসিয়া পড়িল। চমকাইয়া তিনি তাঁর হাতের পানে চাহিলেন। সেখানে শিবের অঙ্গের শ্বেত শুভ্র রং কিছুটা লাগিয়া আছে।

-“রহিম আলী ” চিৎকার করিয়া উঠিলেন জমিদার গিন্নি।

উন্মত্তের ন্যায় ছুটিয়া মন্দির সংলগ্ন আম বাগানে প্রবেশ করিলেন। রহিম বলিয়াছিল পুষ্করিণীর সংলগ্ন তাহার ঘর। পেয়াদাগণ ঘটনারআকস্মিকতায় হতচকিত হইয়া ছুটিল কর্ত্রীকে অনুসরণ করিয়া।

পুকুরের নিকট আসিয়া ডানদিকে একটি ভাঙা ঘর দেখিলেন জমিদার গিন্নি। সকলের বাধা সত্ত্বেও সেখানে প্রবেশ করিলেন তিনি আর যাহা দেখিলেন তাহাতে তাঁর বিস্ময়ের অবধি রহিল না।

সেই ভাঙা ঘরে অনাদরে গজিয়ে ওঠা লতা পাতার ভিতর অবহেলায় পড়িয়া একটি শিবলিঙ্গ। জমিদার গিন্নি কাঁদিয়া তাহার উপর আছাড়িয়া পড়িলেন।

এতেক দেখিয়া নন্দী ও ভৃঙ্গী কৈলাসে ফিরিয়া গেলো।

মহাদেবের তৃষ্ণা নিবারণ হইয়াছে। তিনি হাসিতেছেন। পার্বতী আঘাতের বিষয়ে প্রশ্ন করিলে দেবাদিদেব কহিলেন ,”এ আঘাত নতুন কিছু নয়। ধর্মের নামে মর্তে যে তান্ডব হয় তা সবই এসে আমার অঙ্গে লাগে। যেদিন মানুষ এই সত্য উপলব্ধি করতে পারবে সেদিন শিবরাত্রি উপলক্ষে আমার মাথায় বেল না ভেঙে একে অপরের সেবায় নিযুক্ত হবে। সারা পৃথিবীতে একটাই ধর্ম থাকবে আর তা হলো মানব ধর্ম। আর আমায় ডাকাডাকি বন্ধ করলে আমিও একটু শান্তি পাবো। আমারো তো একটু নিজের মত করে বাঁচার অধিকার আছে। কি বলো গিন্নি। “

পার্বতী করজোড়ে মহাদেবকে প্রণাম করিলেন।

~~~~~~~~~~~~~~

ব্রতকথা শেষ হলে পুরোহিত দিগম্বর আর পিতাম্বরকে বললেন,” মহাদেবের গালের দিকে দেখো। সেই দাগ এখনো আছে।যাক ! তোমরা যে যার অস্ত্র নিয়ে নিতে পারো।” এই বলে অস্ত্র গুলো এগিয়ে দিলেন

দিগম্বর আর পীতাম্বরের দু চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে। ওদের হাতে যেন জোরই নেই যে ওরা অস্ত্র তুলে নেবে।

দুজনেই উঠে পড়লো।

পুরোহিত মশাই বললেন ,”কি হলো ? অস্ত্রগুলো নেবে না ?”

দিগম্বর বললো, “ নেবো তবে সেগুলো দামোদরের জলে আজ রাতেই বিসর্জন দেব। কাল খুব ভোরে গ্রামে যাবো। এই দাঙ্গা বন্ধ করতে হবে। অনেক ভুল করেছি। এবার প্রায়শ্চিত্তর সময়।”

বিনাপুর গ্রামে তখন বিকেল। শেষ সূর্যের রাঙা আলোয় দেখা গেলো চন্ডীমণ্ডপে এক গামলা মুড়ি চানাচুর খেতে খেতে সান্ধ্য আড্ডায় মগ্ন দিগম্বর ,পীতাম্বর , ইদ্রিস আর ইউনুস।

*****************************************

শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *