বিপ্রদাসের জন্ম মৃত্যু – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

Santanu Mukherjee (Joy)

*****************************************

বিপ্রদাস বাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। তাঁর মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। একি শুনলেন তিনি। একি সম্ভব? মৃত্যু সংবাদ সবসময়ই দুঃখের। সে যারই হোক না কেন। কিন্তু তিনি বোধহয় পৃথিবীর প্রথম মানুষ যিনি নিজের মৃত্যু সংবাদ নিজে পেলেন।

ঘটনাটা আরেকটু খোলসা করে বলা দরকার। বিপ্রদাস বাবু বৌয়ের সাথে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। বৌয়ের সাথে ঝগড়াটা এখন দাঁত মাজা , চান করার মতো রোজকার রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপ্রদাস বাবু ভয়ানক রগচটা। আগে তাঁর স্ত্রী সর্বানী সব চুপচাপ মেনে নিলেও ইদানিং একটু প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন। বিপ্রদাস বাবু বিলক্ষণ জানেন এই পরিবর্তনের কারণ তাঁর ছেলে অনামিত্র ওরফে অনি ছাড়া আর কেউ নয়। সে এখন বড় হয়েছে আর তাই বাপের বেয়াদপি দেখলে সে ঘোর প্রতিবাদ করে। বিপ্রদাস বাবুও কম যান না। তিনিও তাকে বাপ্ বাপান্ত করে গালাগাল দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। অনির স্পষ্ট জবাব যে সে থাকে তার ঠাকুরদাদার বাড়িতে। তাই তাকে বের করার সাধ্য কারো নেই। এমনকি বিপ্রদাস বাবুরও নেই।

আজ গন্ডগোলটা একটু বাড়াবাড়ি পর্যায় গেছিলো। বিপ্রদাস বাবু মেজাজ হারিয়ে সামনে রাখা পানের ডিবেটা ছুঁড়ে মারেন স্ত্রী সর্বানীর দিকে। ডান দিকের ভুরুর ওপরে আঘাত লাগে। মাথা ফেটেছে। বাড়িতে ছেলে আছে। এবার শুরু হবে কুরুক্ষেত্র। সর্বানী চিৎকার করে ছেলেকে ডাকতে লাগলো। সেই ফাঁকে বিপ্রদাস বাবু বেরিয়ে গেলেন। কিছু অযাচিত উপদেশ এবার ছেলের থেকে তাঁকে শুনতে হবে। তার থেকে বেরিয়ে যাওয়া ভালো।

সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে সন্ধ্যের দিকে সবে পাটুলির সামনের ভাসমান বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে নস্যির ডিবেটা বের করে নাকে লাগিয়েছেন তখনই ঘটনাটা ঘটে গেলো। একটা গাড়ি বেপরোয়া গতিতে এসে মারলো তাঁকে ধাক্কা আর তিনি চিৎপটাং হয়ে পড়লেন ফুটপাথে। হাত থেকে ব্যাগটা শূন্য উঠলো কিন্তু সেটা পড়লো কিনা দেখার আগেই তিনি জ্ঞান হারালেন।

যখন তিনি চোখ মেললেন তিনি দেখলেন প্রচুর লোক তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। ওই ভিড়ের মধ্যেই ”স্পট ডেড ” কথাটা কানে এলো ? কে স্পট ডেড ? বিপ্রদাস বাবু একটু অবাক হয়ে ভাবলেন। কোনো ভাবে উঠে বসে জিগেস করলেন,” কে স্পট ডেড ?”

যা উত্তর পেলেন তাতে তিনি চমকে উঠলেন। এক কনস্টবল জানালো মৃতের নাম বিপ্রদাস বন্দোপাধ্যায়।

তাহলে তিনি কে ? তিনিই তো বিপ্রদাস বন্দোপাধ্যায়। তবে কি তিনি আর বেঁচে নেই। তিনি মানে যিনি এখন উঠে বসেছেন তিনি জীবিত নন। তাঁরই সুক্ষ শরীর ? বিপ্রদাস বাবুর ভয় হলো। উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। ভিড়ের মধ্যেই কেউ কেউ বললো ,”কি অভদ্র লোক রে বাবা। এতক্ষন সেবা করলাম একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিলোনা ?”

বিপ্রদাস বাবুর কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। কারণ তিনি বুঝে গেছেন যে তিনি আসলে মৃত। সেটা এরা এখনো বোঝেনি। বডিটা নিশ্চই এরা ভালো করে খেয়াল করেনি। বেশি ভিড়টা বডিটাকে ঘিরে আর কম ভিড় ছিল তাকে ঘিরে। এরা যে মুহর্তে বুঝবে রাস্তায় উপুড় হওয়া মৃত লোকটা আর তিনি আসলে একই লোক তখন এখানে হুলুস্থুলু শুরু হয়ে যাবে। তার থেকে এখন কেটে পড়াই ভালো।

নিজেকে খুব হালকা লাগছে। বিপ্রদাস বাবু জানেন আত্মা হালকা হয়। ক্রমশ আরও হালকা হয়ে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। তখন তাঁকে আর কেউ দেখতে পাবেনা। এখনো অবধি তাঁকে দেখা যাচ্ছে। তবে সেটা বেশিক্ষন যে স্থায়ী হবেনা সেটা তিনি বিলক্ষণ জানেন। কিছুদিন আগেই স্বামী অভেদানন্দর “মরণের পরে“ বইটা শেষ করেছেন। মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে তাঁর ধারণা বেশ পরিষ্কার।

বাড়ি পৌঁছে বিপ্রদাস বাবু দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন।

বাইরের ঘরে ছেলে বসে। তিনি যে ঢুকলেন সেটা ছেলে অনি যেন খেয়ালই করলোনা। সে নিজের মতো মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। একটা লোক সকালে বেরিয়ে রাতে ফিরলো তাতেতো মানুষ জিগেস করে যে সে কোথায় ছিল। অনি যেন বুঝতেই পারলোনা যে ঘরে কেউ ঢুকেছে। তার মানে কি ? ভয়ে ভয়ে ভাবলেন বিপ্রদাসবাবু। মানে একটাই। তিনি এবার তার স্থূল দেহ হারাচ্ছেন। সুক্ষ শরীরে বিচরণ করছেন।

শোবার ঘরে ঢুকে দেখলেন সর্বানী চোখে জল নিয়ে খাটের একটা কোণে বসে। বিপ্রদাস বাবু ঢোকার কোনো প্রতিক্রিয়া তার মধ্যে হয়েছে বলে বোঝা গেলোনা। বিপ্রদাসবাবুর দিকে তাকালেনইনা সর্বানী। খাটে কিছু কাগজ রাখা। কি কাগজ এগুলো ? বিপ্রদাসবাবু দেখলেন সেগুলো সার্টিফিকেট। জীবনবীমার সার্টিফিকেট। প্রচন্ড আঘাত পেলেন তিনি। তাঁর মৃত্যু সংবাদ আসতে না আসতেই এরা জীবনবীমার সার্টিফিকেট বার করে ফেলেছে ? এই কি তাঁর প্রাপ্য ছিল ? বিপ্রদাস বাবু ধপ করে খাটে বসে পড়লেন। সর্বানী অবিচল। বিপ্রদাসবাবু মনে মনে ভাবলেন এটাই তো স্বভাবিক। তিনি তো আর জীবিত নেই যে তাঁর স্ত্রী তাঁকে আসতে দেখে দৌড়ে চা করে আনবে। তিনি এখানে সুক্ষ শরীরে উপস্থিত আছেন।

মাথাটা এখন আরtও হালকা লাগছে। মৃত্যুর পর তো তাই হয়। কিন্তু এবার তিনি কি করবেন ? এই ভাবে তো ঘুরে বেড়াতে পারবেননা। তাঁর মুক্তি কি করে হবে? বিপ্রদাস বাবু আর ভাবতে পারছেননা। তাঁর জীবনে এরকম দিন যে আসবে সেটা তিনি ভাবতেও পারেননি।

বাড়ির ভেতর এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা। তাঁর মৃত্যুতে কারো তেমন শোক চোখে পড়লোনা। বিপ্রদাস বাবু আবার বসার ঘরে এলেন। অনি এখনো মোবাইলেই মুখ গুঁজে। মনে হয় আত্মীয়দের খবর দিচ্ছে। বিপ্রদাসবাবু মনে মনে ভাবলেন তাঁর এটাই পাওনা ছিল। সারা জীবন বৌটাকে একটু শান্তি দেননি। আজ গায়ে পর্যন্ত হাত তুলেছেন। অনুতাপ হলো তাঁর। একটা ক্ষমা চাইলে ভালো হতো। কিন্তু খুব দেরি হয়ে গেছে। অনির দিকে একটু এগোলেন তিনি।অনি সেটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে উঠে চলে গেলো তার মায়ের ঘরে। আর তারপরেই সর্বানীর গলায় কান্নার আওয়াজ পেলেন। নাঃ সর্বানী কাঁদছে মানে তাঁকে হয়তো ক্ষমা করেছেন।

এর মধ্যে দরজায় বেল বেজেছে। দরজা খোলাই ছিলো। বিপ্রদাস বাবু দেখলেন একজন পুলিশ কনস্টবল দাঁড়িয়ে। বিপ্রদাস বাবু বুঝলেন ইনি অনিকে নিয়ে যেতে এসেছেন। বডি নিয়ে আসতে হবে।

বিপ্রদাসবাবু নিজেই এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। কনস্টবল তাঁকে একটা ব্যাগ দেখিয়ে বললো ,”এটা কি আপনার ব্যাগ ”

বিপ্রদাস বাবু একটা ঢোক গিলে বললেন ,”হ্যাঁ ! আমারই তো “

কনস্টবল বললো ,”পাটুলির কাছে একসিডেন্টে যে ভদ্রলোক মারা গেছেন তাঁর পাশেই পড়েছিল। আপনারওতো ধাক্কা লেগেছে। এখন ঠিক আছেন ? আপনার ভাগ্য ভালো যে গাড়িটা আপনার পাশ দিয়ে ঘষে বেরিয়ে গেছে। সামনেই এক ভদ্রলোক রাস্তা পেরোচ্ছিলেন। তাঁকে পুরো পিষে দিয়েছে। আপনি পড়লেন ফুটপাথে আর আপনার হাতের ব্যাগটা মৃত ভদ্রলোকের পাশে |”

বিপ্রদাসবাবু চোখ গোল গোল করে বললেন ,”মৃতের পরিচয় জানতে পেরেছেন ?”

কনস্টবল বললো ,”হ্যাঁ। রমাকান্ত হালদার। গড়িয়াতে থাকেন। প্রথমে ব্যাগটা ওনার ভেবে আপনার নাম বলে অনেকে ভুল করেছিল। পরে অবশ্যি সব জানা যায়। ওর মেয়ে এসে বডি সনাক্ত করে গেছে। যাক আপনি ডাক্তার দেখিয়ে নেবেন। অনেক সময় খুব জোরে চোট লাগলে প্রথমে বোঝা যায়না। পরে ব্যথা বাড়ে। “

বিপ্রদাসবাবু ব্যাগটা নিয়ে বললেন ,”হ্যাঁ দেখিয়ে নেব।”

পেছনে ঘুরতেই দেখলেন সর্বানী দাঁড়িয়ে। তিনি সব শুনেছেন। ছুটে এসে জিগেশ করলেন ,”কি হয়েছিল তোমার ?”

বিপ্রদাস বাবু অভিমানের সুরে বললেন ,”ছাড়ো ! এতক্ষন এসেছি। কেউ তাকিয়েও দেখলেনা। “

সর্বানী কেঁদে বললেন ,”অনি বারণ করেছিল। তুমি সকালে আমায় মারার পর ও বললো আজ বাবা এলে আমরা কেউ কথা বলবোনা। বাবাকে বুঝতে হবে যে তিনি অন্যায় করেছেন।”

অনিও ততক্ষনে এসে দাঁড়িয়েছে। বিপ্রদাস বাবু বললেন ,” ওতো ঠিকই বলেছে। আমিই অমানুষ। তবে বিশ্বাস করো এবার থেকে আমি আর কক্ষনো ঝগড়া করবোনা। যে কদিন বাঁচবো সবাইকে নিয়ে আনন্দ করে বাঁচবো। ”

অনি জীবনবীমার সার্টিফিকেট গুলো বাবার হাতে দিয়ে বললো ,”বাবা এগুলো তুলে রাখো। এটা বের করে মাকে দেখাচ্ছিলাম যে তুমি মায়ের কথা ভাবো আর তাই এতোগুলো জীবন বীমা করে মাকে নমিনি করে রেখেছো। শুধু তোমার রাগটা একটু কমাও। তোমায় নিয়ে কোনো অভিযোগ আমাদের নেই। আমরা জানি তুমি মানুষটা ভেতর থেকে খারাপ নও।

বিপ্রদাস বাবু ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন ,”আমি আজ সত্যি সত্যি পুনর্জীবন পেলেন রে অনি। নতুন জন্ম পেলাম “

*****************************************

শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *