ভিখিরি – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

**************************************

“দশটা টাকা দেবে ?”

প্রশ্নটা শুনে পেছনে তাকাতেই বাচ্চা মেয়েটাকে দেখতে পেলাম। বয়েস বড়জোড় আট কি নয়। ময়লা জামা। একদিকের ফিতে কোমর থেকে মাটিতে লুটোচ্ছে। কাঁধের কাছে হুক খোলা আর পেছনে একটা মুমূর্ষু সেফটিপিন জামাটার ভার ধরে রেখেছে।

আমি একটা গাড়ির শোরুমে ঢুকতে যাবো। অনেকদিনের ইচ্ছে নিজের গাড়ি কিনবো। মেয়েটার ডাকে থমকাতে হলো।

আমার জ্ঞান দেয়া স্বভাব। তাই এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলোনা। বেশ ঝাঁঝিয়ে বললাম ,

-“ভিক্ষে চাইতে লজ্জা করেনা ? কাজ করে রোজগার করিসনা কেন ?”

মেয়েটা ওর হলুদ দাঁত বের করে একটা অবান্তর হাসি দিয়ে বললো ,”করবো তো। বড়ো হয়ে। তোমার মত ব্যাগ নিয়ে অফিস যাবো “

মনে ভাবলাম, “আচ্ছা ফাজিল মেয়ে তো। আমি নয় কাজ করতে বলে চাইল্ড লেবারের ব্যাপারটা একটু উৎসাহ দিয়ে ফেলেছি তাবলে নিজেকে একদম আমার সাথে তুলনা করে বসবে ? পেটে খিদে আর লম্বা লম্বা কথা। টাকা হাতে দিলেই তো ওই চায়ের দোকানে ছুটবে বিস্কুট বা পাউরুটি খেতে।”

-“ ও বাবু …. দাওনা। “ মেয়েটার ডাকে সম্বিৎ ফিরে এলো।

এখানে দাঁড়িয়ে দেরি করার কোনো মানে হয়না। মেয়েটার মুখ দেখে মায়া হলো। জিগেস করলাম, “সকালে কি খেয়েছিস ?”

মেয়েটা নাকের শিকনি জামায় মুছে বললো ,”কিছুনা। দুপুরে ওই খানে মা শীতলার পুজো হয়েছে। ওখানে খাবো। ”

আমি প্রশ্ন করলাম ,”এখন খিদে পায়নি ?”

মেয়েটা উত্তর দিলনা। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।”

খুব অনুশোচনা হলো। কত উল্টোপাল্টা ভাবলাম মেয়েটাকে নিয়ে। দশ টাকা ব্যাগ থেকে বের করে হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম ,”যা খেয়েনে ”

মেয়েটা আমার হাত থেকে একরকম কেড়ে নিয়ে দৌড়ে পালালো। “

আমার সন্দিহান মন। থমকে দাঁড়ালাম। মেয়েটা নাটক করলোনা তো? পেছনদিকে তাকালাম। মেয়েটা দৌড়ে যাচ্ছে। সামনেই খাবার দোকান। হ্যাঁ। যা ভেবেছি। সেখানে না ঢুকে মেয়েটা চলে গেলো পাশের একটা গলিতে।

এই ভাবে লোক ঠকানো ? এই বয়েসে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল ? মনে মনে বললাম,” দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। তোকে আজ পুলিশে দেবো। “

দৌড়োতে গিয়ে খেলাম হোঁচট। পাটা গেলো মচকে। ভাগ্য ভালো মেয়েটার। বেঁচে গেলো। একটু সময় নিয়ে আমি তাও ঢুকলাম গলিতে। ওই তো মেয়েটা। হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে দুলিয়ে দুলিয়ে যাচ্ছে। আর নিস্তার নেই। ধরে ফেললাম।

বেশ রেগে বললাম, “টাকাটা নিয়ে কি কিনেছিস ?”

মেয়েটা প্যাকেটটা তুলে দেখালো। একটানে কেড়ে নিলাম। প্যাকেট বন্দি জিনিসটা বের করে চমকে গেলাম। একটা বর্ণপরিচয়।

আমি বললাম ,”এটা নিয়ে কি করবি ? “

মেয়েটা বললো ,”ভাইকে পড়াবো। বাবাটা মরে যেতে মা ইস্কুল ছাড়িয়ে দিলো। পয়সা নেই। আমি তো পড়েছি দু ক্লাস অবধি। ভাইটা ভর্তিই হয়নি। তাই আমি পড়াশুনো শেখাবো। ও বড় হয়ে তোমার মত ব্যাগ কাঁধে নিয়ে অপিস যাবে। “

আমি কি বলবো ভেবে পেলামনা। চোখ ঝাপসা। গলা ধরে আসছে। কথা বলা মুশকিল। কোনো ক্রমে নিজেকে সামলে বললাম ,”ক্যালেন্ডার দেখতে পারিস ?”

মেয়েটা একটা বিরাট মাথা নেড়ে বললো ,” হ্যাঁ “

আমি বললাম প্রত্যেক মাসের এক তারিখে বিকেল পাঁচটায় এই চায়ের দোকানটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকবি। তোদের দুজনের পড়াশুনোর টাকা আমি দিয়ে যাবো।”

আজ প্রায় আট মাস হয়ে গেলো। মেয়েটার সাথে মাসে একদিনই দেখা হয়। সেদিন হটাৎ ঢিপ করে একটা প্রণাম করে বললো রেজাল্ট বেরিয়েছে। নতুন ক্লাসে উঠেছে। তাই আমায় মিষ্টি মুখ করাতে একটা লজেন্স নিয়ে এসেছে। ওর থেকে লজেন্সটা নিয়ে মুখে দিলাম।

নাঃ গাড়ি আর কেনা হয়নি। তবে এই তৃপ্তি বোধ হয় পৃথিবীর সবচেয়ে দামি গাড়িও দিতে পারতোনা।

********************************************

শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *