“হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন”- শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

ভাষা দিবস উপলক্ষে এ সপ্তাহের নতুন গল্প –

******************************************

বিলেত ফেরত ছেলে শোভনের এবং তার স্ত্রী নীলিমার সাহেবীপনায় যতোটা না বিব্রত হলেন অশীতিপর অসিতবাবু তার থেকে বেশি বিচলিত হলেন দশ বছরের নাতি রণের মাকে “মামী“ ডাকতে শুনে।
শেষে বলেই ফেললেন ,” খোকা সব কিছু মানলাম কিন্তু মাকে মামী বললে ওর মামার বাড়ির লোকেরা কেন মেনে নেবে ?”
শোভন হেসে উত্তর দেয় ,”বাবা ওটা মাম্মি। মামী নয়।”
অসিতবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,” তাও ভালো “।
 
শোভন স্ত্রী নীলিমাকে নিয়ে আজ বারো বছর বিদেশে আছে। ছেলে রণ ওখানেই জন্মেছে। এটা রণের দ্বিতীয় ভারত সফর। প্রথমটার কথা ওর মনে নেই। সে আজি প্রথম তার গ্রান্ডপা অসিত বাবুকে দেখলো। সোজা গ্যাটউইক এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাইট নিয়ে দুবাই দাঁড়িয়ে দমদম নেমে ওরা এসেছে ওদের আদি বাড়ি মেদিনীপুরের গ্রাম চালাপোতায়। আসা অবধি নীলিমার এটা ধোরোনা , এটা করোনা , এটা খেয়োনা ইত্যাদি শাসনে সবাই মুখে কিছু না বললেও অতিষ্ট হয়ে পড়েছে । রণেরও একবেলা থেকে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে। দুপুরের পুকুরের মাছের ঝোল দেখে নাক সিঁটকিয়ে উঠে গিয়ে এয়ারপোর্টে কেনা স্যান্ডউইচ খেয়ে পেট ভরিয়েছে। তারপর এসি না থাকার জন্য একটু মেজাজ দেখিয়ে যখন ছাদে উঠে গেলো তখন অসিত বাবু আর না পেরে বলেই ফেললেন ,”তোমাদের ওকে একটু আগাম সতর্ক করে নিয়ে আসা উচিত ছিল” আর ব্যাস এই কথাতেই গোল লেগে গেলো। নীলিমা বেশ রাগের সাথে বলে উঠলো , “আই ওয়াস এক্সপেকটিং দিস। আজ রাতটুকু একটু মানিয়ে নিন। আমরা কালকেই চলে যাবো। ”
কথাটা এতোই জোরে বলা হয়েছে যে সেটা রণের কানে গেলো আর সে ছুটে এসে জানালো যে সে আজকেই যেতে চায়। এই গ্রান্ডপার সাথে থাকা সম্ভব নয়।
অসিত বাবু হালকা ভাবে বললেন ,”আজকের দিনটা থেকে যাও। ”
নীলিমা সেখান থেকে সশব্দে প্রস্থান করলো। ভ্যাবাচ্যাকা মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো শোভন আর রণ সামনে উঠোনে কানে হেডফোনে হার্ড রক মিউজিক চালিয়ে নেমে পড়লো।
 
বিকেল হয় হয়। অসিতবাবু এসে নাতির কাঁধে হাত রেখে বললেন ,” কালকেই তো চলে যাবে। আমি-ও আটকাবোনা। কিন্তু আমায় দুটো প্রমিস করবে ?
-“হোয়াট প্রমিস ?” রণের বিরক্তি মাখানো প্রশ্ন |
অসিতবাবু বললেন ,”আমার সাথে চলো। তোমায় একটু গ্রাম দেখিয়ে আনি। আর আজ রাতে আমার কাছে তুমি শোবে ? জাস্ট এই দুটো “
রণের কি মনে হলো কে জানে। সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো ,” ওকে ডান। বাট ইউ অলসো প্রমিস মি দ্যাট ইউ ওন্ট রিকোয়েস্ট মি টু স্টে টুমোরো। “
অসিতবাবু-ও হাত বাড়িয়ে বললেন ,” ওকে ডান “
 
দাদু আর নাতি বেড়িয়ে পড়লো গ্রামের পথে। প্রথম মোড় ঘুরতেই একটা পাঠশালা সবে ছুটি হয়েছে। ছেলেরা হুড়মুড়িয়ে ফুটবল খেলছে। রণ চেঁচিয়ে উঠলো, “ ওঃ দে আর প্লেয়িং সকার ইন মাড।“
অসিতবাবু বললেন ,” ওরা রোজই এভাবে খেলে। কিচ্ছু হয়না ওদের। তুমি কি করো বিকেলে ?”
রণ জানালো সে ট্যাবে সকার খেলে। কিন্তু মাঠে খেলার সুযোগ পায়নি। “
ওরা এসে দাঁড়ালো নদীর ধরে। ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ঢেউ ভাঙছে পাড়ে। কয়েকটা পাল তোলা নৌকো ভেসে যাচ্ছে। অস্তরাগের রক্তিম আলোয় মনে হচ্ছে কেউ জলে আলতা গুলে দিয়েছে।
রণের মুখ দিয়ে একটা শব্দ বেরোলো শুধু। সেটা বিরক্তির নয়। বিস্ময়ের।
ততক্ষনে তার দৃষ্টি চলে গেছে পলাশ গাছের নীচে। একজন বাঁশিতে মেঠো সুর বাজাচ্ছে। অসিতবাবু বললেন ,” চলো এটা তোমার রক এন্ড রোল কানে ভালো লাগবেনা। “ বললেন বটে কিন্তু বাঁশির করুন টানে অসিত বাবু দেখলেন রণের চোখে জল।
রণ স্বগতোক্তির মত বললো ,”আই উইল লার্ন দিস|”
অসিতবাবু সামান্য হেসে বললেন,” সেতো একদিনে হবেনা। অন্তত ৬ মাস থাকলে ফুঁ দেয়া শিখতে পারবে।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ালো রণ।
রাত হয়ে এসেছে। আকাশে চাঁদ জোছনার আলো যেন উগরে দিয়েছে পৃথিবীর ওপর। রণ দাদুকে বললো ,”নেভার থট দিস ক্যান বি সো বিউটিফুল। ক্যান উই স্টে বিট লংগার ? “
অসিত বাবু বললেন ,”না দাদুভাই। এতক্ষনে হয়ত বাড়িতে হাঁক ডাক পড়ে গেছে ”
বাড়িতে ফেরার পর নীলিমা আর শোভন পরিষ্কার রণের মধ্যে একটা পার্থক্য দেখলো। এই রণ অনেক বেশী মার্জিত। এইটুকু সময় কি হলো কে জানে ? সেই ধারণায় শীল মোহর লাগলো যখন রণ জানালো রাতে সে শোবে তার গ্রান্ডপার কাছে। নীলিমা ক্ষীণ আপত্তি তুলেও রাজি হলো ছেলের মুখ চেয়ে।
 
পরদিন সকালে ছেলে ঘোষণা করলো সে মত বদলেছে আর এই কোত্থাও যাবেনা। নীলিমা অবাক। কি হলো একরাতের মধ্যে যে ছেলে এতটা বদলে গেলো। নীলিমা একটু তাতিয়ে দিতে রণকে বললো ,”বাট ইউ হ্যাভ লেফট শার্লক হোমস বুক ইন কলকাতা। এন্ড ইউ কান্ট্ স্লীপ বেটা উইথ আউট স্টোরিজ। ”
-“আই উইল ম্যানেজ ” এইটুকু বলে সে তার মোবাইলে একটা বাঁশির সুর চালিয়ে দিলো।
সেই রাতেও রণ জেদ করে অসিত বাবুর কাছে শুলো। নীলিমার হাজার আপত্তি কোনো কাজে এলোনা। হঠাৎ নীলিমা স্বামী শোভনকে বললো ,”বাবা ওকে নেশার কিছু দিচ্ছে নাতো ? এলস এই চেঞ্জ ইম্পসিবল। আজ আমি আড়াল থেকে নজর রাখব।”
শোভনের ক্ষমতা নেই এর ওপর কথা বলে। অগত্যা বৌকে অনুসরণ করলো।
অসিত বাবুর দরজা হালকা ফাঁক। ওরা গিয়ে কান পাতলো।
রণের গলা। ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলেছে ,”কালকের স্টোরিটার প্লিজ এন্ডিংটা বলো। গণেশ নিয়ে গ্রান্ড পা আর রুকু লায়নের মুখে হাইড করে রাখলো। মগনলাল কি করে পেলো ওটা এন্ড হোয়াট ডিড ফেলুদা ডু?”
এবার অসিত বাবুর গলা ,”বলবো। তার আগে বোলো তুমি গেলেনা কেন ?”
রণ বললো,”আমি স্টোরিটার এন্ডিং না জেনে কিছুতেই যাবোনা।”
অসিতবাবু হেসে গল্প শুরু করলেন।
বাইরে হতবম্ভের মত দাঁড়িয়ে শোভন আর নীলিমা। কি উপায়টাই না বের করেছে আটকে দেবার জন্য।
ওরা বারান্দায় চেয়ারে বসলো। নীলিমা বললো,”বাবার কাছে একটা আপলোজি চাইতে হবে !”
 
এর মধ্যে ঘড়িতে ঢং ঢং করে বারোটা বাজার সাথে গল্প শেষ হলো। আবার রণের গলা ,” হোয়ের আর ইউ গোয়িং গ্রান্ড পা “
অসিত বাবু বললেন ক্যালেন্ডারে ডেটটা পাল্টে আসি। আজ ২১ শে ফেব্রুয়ারি | ভাষা দিবস। কাল তুমি সব কথা বাংলায় বলার চেষ্টা করবে তাহলে তোমাকে একটা জাতিস্মর ছেলের গল্প শোনাব যার নাম মুকুল। ”
নীলিমা ঘাড় ঘুরিয়ে নাইট ল্যাম্পের হালকা নীল আলোয় দেখলো রণ বুড়ো আঙ্গুলটা তুলে বলছে, “প্রমিস করলাম “||
*****************************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )
#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *