বলটুর প্রেম – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

********************************************

Profile 1সুদর্শন বসু বা বলটুকে সবাই বেরসিক বলেই জানে। সিনেমা দেখেনা , গান শোনেনা ,খেলা নিয়ে কোনো উৎসাহ নেই এমনকি একটা গার্লফ্রেন্ড পর্যন্ত নেই। যদি কোনো একটি বিষয়ে তার উৎসাহ থাকে সেটা হলো খাওয়া দাওয়া। প্রতিদিন যে চারতলা টিফিন কৌটোটা নিয়ে আসে সেটা অনেকের মনেই ঈর্ষার সঞ্চার করে। অমন যত্ন করে প্রতিদিন নিত্যনতুন রান্না পাওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার। আর সপ্তাহে একদিন কোনো রেস্তোরাঁ থেকে খাবার অর্ডার করে। পুরোটাই একা গোগ্রাসে খায়। কাউকে অফার করার ভদ্রতাটা ওর ধাতে আসেনা। বলটুকে নিয়ে অফিসে মাঝে মাঝেই আলোচনা চলে। কি ভাবে ওর সময় কাটে ? কি পদার্থ দিয়ে যে গড়া ! এরকম নানা উড়ো মন্তব্য আসে বল্টুর উদ্দেশে। কিছু কিছু বলটুর কানেও আসে। কিন্তু তাতে তার কোনো হেলদোল বা মাথাব্যথা নেই। সে জানে সে ওইরকমই আর তাতে যদি অন্য কারো মাথা ব্যথা হয় সেটা তাদের সমস্যা।

এই তো সেদিন অফিসের ডাকসাইটে সুন্দরী কলিগ রূপাঞ্জনা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বসলো যে সে যদি কিছু অনুরোধ করে তবে বলটু ফেলতে পারবেনা।
ঠিক হলো রূপাঞ্জনা বলটুকে চা খেতে নিয়ে যাবে। বলটু কিছুতেই না করতে পারবেনা। সেটা সে বিলক্ষণ জানে।
আর সেই সুযোগেই সে বন্ধুত্ব পাতাবে বলটুর সাথে আর প্রমাণ করবে ওই মেয়েদের প্রতি উদাসীনতা আসলে বলটুর নাটক।
– “কবে যাবি?” জিগেস করলো সুমিতা।
– “কাল যাবো“ রূপাঞ্জনার সংক্ষিপ্ত উত্তর।
বিপাশা বললো, “এই ! আমার মাথায় একটা দারুন বুদ্ধি এসেছে। বলবো ?”
দুষ্টু বুদ্ধিতে বিপাশার জুড়ি মেলা ভার সেটা সবাই জানে। তাই বাকিরা উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলো কি সেই বুদ্ধি।
বিপাশা বললো ,”দেখ আজ ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখ। রূপাঞ্জনা আজ থেকে ভাব জমাবে বলটুর সাথে। ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন্স ডে কদিন পরেই। ওইদিন রূপাঞ্জনা বলটুর সাথে ডেটিং করতে যাবে। আমরা পেছনে শ্যাডো করবো। যে মুহূর্তে বলটু কোনো বেচাল চলবে অমনি আমরা ওকে ঘিরে ধরে ওর মুখোশ খুলে দেব। কি রে রাজি ?”
রূপাঞ্জনা বললো ,”রাজি ”
পরদিন বিকেলে রূপাঞ্জনা বলটুর টেবিলের কাছে এসে বললো ,”শুধু মুখ গুঁজে কাজ করলে হবে ?”
-“ওটা করতেই তো অফিস আসি ” বলটুর নির্লপ্ত জবাব।
রূপাঞ্জনাও নাছোড়। একটু ঝুঁকে বলটুকে বললো ,”নীচে চায়ের দোকানের পশে দারুন জিলিপি ভাজে। যাবে ?”
রূপাঞ্জনা জানে বলটুর দুর্বলতা। কাজও হলো।
বলটু চলো বলে উঠে পড়লো। বেরোবার আগে রূপাঞ্জনা ঘাড় ঘুরিয়ে বিপাশা আর সুমিতার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে একটা বিজয়ীর হাসি দিলো।
শিকার যে জালে জড়িয়েছে তাতে কোনো ভুল নেই। পরদিন আবার দুজন গেলো তেলেভাজা খেতে। আর তার পরদিন আইস ক্রিম।
এর মধ্যে বলটু জেনেছে বুধবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে। সেদিন যে যার ভালোবাসার সাথে সময় কাটায়। কেউ কেউ সেদিন ভেতরের গোপন প্রেম ব্যক্ত করে হাতের ওপর হাত রেখে , কখনো বা ঠোঁটের স্পর্শ দিয়ে। এসব কথা রূপাঞ্জনাই বলেছে বলটুকে। তার এই উৎসাহ কাজে লেগেছে কারণ বলটু আর রূপাঞ্জনা ঠিক করে ফেলেছে যে ১৪ই ফেব্রুয়ারী তারা বাইরে লাঞ্চ করবে আর সেদিন বলটু হাতে হাত রেখে তার ভালোবাসার কথা স্বীকার করবে।
১৩ তারিখ সন্ধ্যেবেলা তিন বন্ধুতে দেখা করলো। বিপাশা বুঝিয়ে দিলো কে কোন পজিশনে থাকবে। আর্সালানে যাবার কথাটা বল্টুই বলেছে। তাই বাড়ি ফেরার পথে রূপাঞ্জনা বিপাশা আর সুমিতাকে নিয়ে জায়গাটা রেকি করে এলো।
অবশেষে এলো সেই প্রতীক্ষিত দিন। ভ্যালেন্টাইন্স ডে। রূপাঞ্জনা এমনিতেই খুব সুন্দরী। তার ওপর ভারী সুন্দর সে সেজে এসেছে। পেয়াঁজের ভেতরের খোসার রঙের বালুচরি শাড়ি আর পিঙ্ক লিপস্টিকে রূপ যেন ফেটে পড়ছে। বলটু কিন্তু রোজ যেমন আসে তেমনি এসেছে শুধু চোখে একটা সানগ্লাস পরেছে।
সাড়ে বারোটায় অফিস থেকে বলটু আর রূপাঞ্জনা বেরিয়ে গেলো আর তার একটু পরেই বেরিয়ে তাদের পিছু নিলো বিপাশা আর সুমিতা।
আর্সালানে একটা কর্নার টেবিলে দুজন বসলো। অর্ডারটা বলটুই করলো , “এক প্লেট মটন বিরিয়ানি”|
রূপাঞ্জনা বুঝলো বলটু একদম প্রেমে পাগল। কাল নিশ্চয়ই হিন্দি সিনেমা দেখেছে। এক প্লেট থেকে দুজনে খাবে। বা খাইয়ে দেবে একে অপরকে। এরকমই কিছু নিশ্চয়ই বলটু প্ল্যান করেছে। মনে মনে খুব হাসলো রূপাঞ্জনা। একবার খাওয়াতে যাক না। সে জানেনা দুটো টেবিল ছেড়ে তাকে হাতে নাতে ধরার জন্য বসে আছে বিপাশা আর সুমিতা।
ওয়েটার এসে বিরিয়ানি দিয়ে যেতেই বলটু একটা চামচে করে খানিকটা তুললো। সেটা মুখের কাছে এনে একটু থামলো । তারপর স্বগতোক্তির মত বলতে লাগলো ,” হে বিরিয়ানি ! তোমার তুল্য এ জগতে আর কেই বা আছে। তোমাকে আমি আমার দেহ মন সব সোঁপে দিয়েছি। তুমিই আমার একমাত্র ভালোবাসা ! তুমি আমার একমাত্র প্রেম। আজ তোমাতে আমার ঠোঁট ছুঁইয়ে এই ভ্যালেন্টাইন্স ডের মর্য্যাদা রক্ষা করবো। তুমি আমার অভিবাদন গ্রহণ করো।” এই বলে চামচের বিরিয়ানিটা চালান করলো সেটা মুখে।
রূপাঞ্জনা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো। বলটু বিদ্রুপের সুরে বললো ,”তাকিয়ে থেকে লাভ নেই। এই সুদর্শন বসু ওরফে বলটু কাউকে খাবারের শেয়ার দেয়না। যা অর্ডার দেবার নিজে দাও। সঙ্গে আসতে বলেছিলে তাই এসেছি। এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করোনা। “
রূপাঞ্জনা উঠে দাঁড়িয়েছে। রাগে ,অপমানে তার সারা শরীর কাঁপছে। হেরে যাবার গ্লানি সে নিতে পারছেনা।
বলটু প্লেট থেকে মুখ না তুলেই বলে গেলো ,”তুমি-ই শিখিয়েছো আজ ভালোবাসার গোপন কথা বলতে হয় প্রেমিকাকে। বিরিয়ানি ছাড়া এতো বড় প্রেমিকা আর কে আছে ?”
রূপাঞ্জনা এক ঝটকায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে সোজা দরজার দিকে হাঁটা লাগলো। রাগ ব্যক্ত করার জন্য মুখ দিয়ে “হুঁহ “ বলে একটা দুর্বোধ্য হুঙ্কার ছাড়লো। আর সাথে সাথেই সে তার “হুঁহ” এর উত্তর হিসাবে শুনলো বলটু তার সমস্ত রোমান্টিসিজম এক জায়গায় এনে বিরিয়ানির আলুতে একটা কামড় দিয়ে ,চোখ বন্ধ করে বললো, “আহা ” ||
*******************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)
#SantanuStory

 

Copyright: Any adoption, publication, translation, film or any other form this story cannot be done without the proper approval of the author. Sharing can be done with due credit to the author.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *