বুড়ো লোকটা – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

Santanu Mukherjee (Joy)

**************

-“মহাশয়ের কি এ পাড়াতেই নিবাস ”
কথাটা শুনে বাঁ দিকে তাকালো রণজয়। কথাটা ওদিক থেকেই এসেছে। কিন্তু সেখানে একটা প্রকান্ড বট গাছ ছাড়া আর তেমন কিছু নেই তো। রণজয় বুঝলো সে ভুল শুনেছে আর তাই সে আবার পা চালালো।
আজ বড়দিন। পঁচিশে ডিসেম্বর। সব অফিস ছুটি কিন্তু রণজয় তার অফিস খোলা রেখেছে। তার ধারনা ফাঁকা অফিসে কাজ হয় ভালো। তাই অন্যদের ছুটি থাকলেও সে একাই আজ অফিস যাচ্ছে। মাঝে মাঝে মালিকদের অনেক রকম অদ্ভুত খেয়াল হয়। এই ছুটির দিনে অফিস করাটা তার মধ্যেই পড়ে। যেমন পড়ে আজ গাড়ি না নিয়ে হেঁটে অফিস যাওয়ার খেয়াল। সকালে মর্নিং ওয়াকে আজ যাওয়া হয়নি। সেই অভাবটা এখন পূরণ করবে। আবার সে হাঁটা শুরু করলো।

-“মহাশয় কি আমায় উপেক্ষা করিলেন ?”

আবার সেই গলা।

রণজয় এবার খেয়াল করলো বট গাছের পেছন দিকে একটা লাল কাপড় উঁকি দিচ্ছে। সেদিকে এগিয়ে রণজয় দেখলো লাল পাঞ্জাবি পরা এক বৃদ্ধ সেখানে দাঁড়িয়ে।
রণজয় বিনীত ভাবে বললো ,”আপনি কি আমায় কিছু বললেন ?”
বৃদ্ধ চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন “ চারদিকে তো আর কাউকে দেখছিনা। তাহলে বাই দি মেথড অফ এলিমিনেশন আপনিই পড়ে রইলেন। “
রণজয়ের ভদ্রলোকের কথা গুলো বেশ বাঁকা ধরনের লাগলো। তাও সে সংযত ভাবে বললো ,” কি বলুন !”
বৃদ্ধ বললেন ,”অপিস যাচ্ছেন ?”
-“হ্যাঁ ” রণজয়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর
বৃদ্ধ বেশ অবাক হয়ে বললেন ,”কিন্তু আজ তো অফিস ছুটি। কেন দাদা চাপ নিচ্ছেন ?”

এবার রণজয়ের বেশ রাগ হলো। ঝাঁঝিয়ে উঠে সে বললো ,” তাতে আপনার আপত্তির কোনো কারণ বা অধিকার আছে কি ?”

বৃদ্ধও গলা চড়িয়ে বললেন ,” আলবাত আছে। বাড়িতে ছোট ছেলেটা এতো অনুরোধ করলো অফিস না যেতে। তা একটা দিন ওর কথা রাখতে পারলেন না? টাকার এতো লোভ ? পরিবার আত্মীয়র চেয়ে টাকাটা এতো বড়ো ?”

কিছুটা হকচকিয়ে গেলো রণজয়। এমন ধমক শেষ সে খেয়েছে সান্তা স্যারের কাছে। সান্তা স্যার মানে ইস্কুলের অঙ্ক স্যার বিনোদবাবু। লম্বা সাদা চুল আর সাদা দাড়ি গোঁফের জন্য ছাত্ররা আড়ালে সান্তাক্লজ বা সান্তা স্যার বলে ডাকত। ভীষণ রাশভারী ছিলেন। ধমক দিলে বুক কেঁপে যেত। তিনিই একবার রণজয়কে বাড়ি গিয়ে ধমকে এসেছিলেন কারণ রণজয় ক্লাসের পরীক্ষায় ফার্স্ট না হয়ে সেকেন্ড হয়েছিল বলে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলো। আর সেটা শুনে সান্তা স্যার বাড়ি গিয়ে ধমক দিয়ে বলেছিলেন ,”জীবনে ফার্স্ট হওয়াটাই কি সব ? আগে ভালো মানুষ হতে হবে। কদিন পরে কেউ মনে রাখবেনা যে ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষায় রণজয় ফার্স্ট হয়েছিলো না সেকেন্ড হয়েছিলো।”

বুড়োর ধমক শুনে সেই কথা মনে পড়ে গেলো রণজয়ের। এই ভদ্রলোকেরও লম্বা চুল আর সাদা দাড়ি গোঁফ। কিন্তু ইনি বিনোদ সেনগুপ্ত বা সান্তা স্যার নয়। বিনোদবাবু তিন বছর হলো মারা গেছেন।

এই সব ভাবতে ভাবতে একটু ঘোরেরমধ্যে চলে গেছিলো রণজয়। বুড়োর ধমকে আবার সম্বিৎ ফিরে এলো।
– “কি ভাবছো হাঁ করে? বাড়ি যাও। ছেলেটা অপেক্ষা করছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বুঝবে এই কেরিয়ার টেরিয়ার সব মায়া। লোকে এসব ভুলে যাবে। যা থাকবে সেটা হলো সম্পর্ক। বন্ধুত্ব। আত্মীয় স্বজন।“
শেষের কথা গুলো ভদ্রলোক বললেন বোঝানোর মতো করে। ধমকের সুরে নয়।

রণজয়ের কেন জানি রোখ চেপে গেলো। একজন কোম্পানির এম ডি কে একটা অচেনা উটকো লোক ধমকে যাবে ,জ্ঞান দেবে এসব কিছুতেই হতে পারেনা। তার আত্মাভিমানে লাগলো। আর সেই কারণেই মুহূর্তের জন্য বুড়োর কথা ঠিক মনে হলেও সে বুড়োকে পাশ কাটিয়ে অফিসের দিকে পা বাড়ালো।

এদিকে বুড়োও নাছোড়। তিনি হঠাৎ রণজয়ের হাত টেনে ধরলেন। চিৎকার করে বললেন ,”কথা কানে গেলো না ?বললাম না বাড়ি যেতে ?”

রণজয় এই অতর্কিত আক্রমণ ঠিক আশা করেনি। জোর করে হাতটা ঝটকায় সরিয়ে নিতে গেলো আর তাতে হলো এক বিপত্তি। বুড়ো উল্টে পড়লো রাস্তার ওপর আর ঠোঁটের ওপরে ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো।

এটা রণজয় চায়নি। সে দৌড়ে বুড়োকে তুলতে গেলো কিন্তু ততক্ষনে ভদ্রলোক নিজেই উঠে দাঁড়িয়েছেন আর ডান হাতটা ওপরে তুলে বুঝিয়ে দিলেন তিনি ঠিক আছেন। রণজয় দেখলো আগন্তুক আবার বট গাছের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সে একবার চিৎকার করে বললো,”লাগেনি তো ?”
উত্তর এলো ,” বাড়ি যাও, বাড়ি যাও।”

এরপর রণজয়ের আর অফিস যেতে ইচ্ছে করলোনা। সে বাড়ি ফিরে এলো। তাকে দেখে ছেলে ঋকের সেকি আনন্দ। ঋক দৌড়ে গিয়ে মাকে ডেকে বললো ,” মা সান্তাক্লজ প্রমিস রেখেছে। আমি রাতে গিফ্ট চেয়েছিলাম আজ যাতে বাবা অফিস না যায়। দেখো বাবা এসে গেছে।” এই বলে বাড়িতে সদ্য সাজানো ক্রিস্টমাস ট্রির নিচ থেকে একটা উল্টে পড়ে থাকা সান্তাক্লজ পুতুলকে কোলে তুলে নিলো। তারপর পুতুলটা রণজয়ের হাতে দিয়ে বললো,”বাবা একে থ্যাংক ইউ বলো ”

রণজয় হেসে পুতুলটা হাতে নিলো আর যেটা দেখলো তাতে ওর শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেলো। ২ ফুট পুতুলের তুলোর দাড়ি গোঁফের ফাঁকে যে ঠোঁটটা দেখা যাচ্ছে সেখানে একটা দাগ। দিনের আলোয় সে স্পষ্ট বুঝতে পারলো যে সেই দাগ জমাট বাঁধা লাল রক্তের ছাড়া আর কিছুই না।
***************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)
#SantanuStory

Copyright: Any adoption, publication, translation, film or any other form this story cannot be done without the proper approval of the author. Sharing is allowed with pleasure but with Author Credit.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *