​ সরস্বতী – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

**********************************
Profileগঙ্গাধরপুর গ্রামের সবচেয়ে বড় ইস্কুল “চিরন্তনী পাঠগৃহ “ বরাবরই লোকের কাছে কৌতূহলের কারণ। এটি একমাত্র কোয়েড ইস্কুল অর্থাৎ ছেলে মেয়ে দুজনেই পড়তে পারে। হেডমাস্টার সুধাময় বাবু খুবই প্রশস্ত মনের মানুষ। সবাইকে সমান সুযোগ দেয়া বা সবাইকে একসাথে নিয়ে চলতে বিশ্বাস করেন। এর ফলে বাকিদের কাছে তিনি বেশ বিরাগ ভজন। ইতিহাসের মাস্টার গোপেশ্বর বাবু সেদিন বলেই ফেললেন ,”হেডমাস্টার যা বাড়াবাড়ি করছেন তাতে ইস্কুল উচ্ছন্নে যেতে বিশেষ দেরি নেই।” সংস্কৃত মাস্টার ভূপেন ভট্টাচার্য টিকিতে পাক দিতে দিতে বললেন ,”যে ভাবে আশপাশের গ্রাম থেকে মুসলমান ছেলে মেয়েরা এসে ভর্ত্তি হচ্ছে তাতে দুদিন পর সংস্কৃত পাঠ বন্ধ না করতে হয়।“

ইস্কুলে নতুন শিক্ষক এসেছে বিপ্লব হালদার। তার সাথে হেডমাস্টারের খুব খাতির। দুজনের চিন্তা ধারায় বেশ মিল। ইস্কুলে প্রতিবারের মত এবারেও সরস্বতী পুজো হবে। হেডমাস্টার সুধাময় বিপ্লবকে ডেকে বললেন ,”বিপ্লব এই নাও পঁচিশ হাজার টাকা। এবারে অনেক চাঁদা উঠেছে। জমিয়ে পুজো করো। আরো লাগলে আরও দেব।”
বিপ্লব টাকা নিয়ে বেরোতেই তাকে ছেঁকে ধরলেন অন্য শিক্ষকরা। তাদের সবার বক্তব্য আছে পুজো নিয়ে। বিপ্লব সব ধৈর্য্য ধরে শুনে বললো ,”আচ্ছা আমি দেখবো কি করা যায় ”
বিপ্লব চলে গেলে সংস্কৃত স্যার ভূপেন ভট্টাচার্য্য বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। অসহযোগ আন্দোলন। জানিয়ে দিলেন ,”কোনো সাহায্য করা হবে না। বড্ড দেমাক হয়েছে ছোকরার। দেখি কি করে একা পুজো করে।”
ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে একদিন হেডমাস্টার সুধাময় বাবু বিপ্লবকে ডেকে বললেন ,”দেখ বিপ্লব এরা তোমায় কোন সাহায্য করবে বলে মনে হয়না।ভেবেছিলাম আমি তোমার সাথে কোমর বেঁধে নামবো কিন্তু কি মুশকিল দেখ। সরস্বতী পুজোর আগের দিন ইনস্পেক্টর আসবে ইস্কুল পরিদর্শনে। সেই নিয়ে আমি কদিন ব্যস্ত থাকবো। তুমি এক কাজ করো। ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে একটা ছোট দল বানিয়ে পুজোটা তুলে দাও “
বিপ্লব মুচকি হেসে বললো ,”ভাববেন না। সব হয়ে যাবে”
দেখতে দেখতে পুজো চলে এলো। পরদিন পুজো। ইস্কুলে সাজো সাজো রব। আজ আবার ইন্সপেক্টর আসবেন। সব মিলিয়ে হৈ চৈ কান্ড।
বিপ্লব একটা পলাশ গাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে। ইতিহাসের শিক্ষক গোপেশ্বর বাবু এসে দাঁড়ালেন। পাশে সংস্কৃত শিক্ষক ভূপেন বাবু আর অঙ্ক শিক্ষক নিত্যানন্দ বাবু।
কোনো ভূমিকা না করেই সোজা প্রশ্ন করলেন বিপ্লবকে।
-“ঠাকুর কোথায় ?কখন আনবে ?”
বিপ্লব বাঁশি থেকে মুখ তুলে বললো ,”ঠাকুর তো এসে গেছে। ”
-“ঠাকুর এসে গেছে?” প্রায় একসাথেই তিনজনে বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলো।
ভূপেনবাবু বললেন ,”ঠাকুর এসে গেলো আর কেউ দেখতে পেলোনা ? তুমি কি ইয়ার্কি মারছো ?”
বিপ্লব শান্ত ভাবেই বললো ,”না। একদম ইয়ার্কি মারছিনা। দেখবেন চলুন। ”
বিপ্লব পা বাড়ালো ইস্কুলের দিকে। সঙ্গে তিন মাস্টার।
ক্লাসে ঢুকে দাঁড়ালো বিপ্লব। সবাই টানটান হয়ে বসে। বেঞ্চের কোনায় একটা নতুন মেয়ে বসে। গায়ের রং আর জামার রং দুটোই ময়লা। অনেকদিনের অপুষ্টির চিহ্ন তার চোখে মুখে স্পষ্ট। সেই মেয়েটার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বিপ্লব বললেন ,”ওই দেখুন সরস্বতী। আজকেই নিয়ে এলাম। ”
গোপেশ্বর বাবু যতটা গলা তোলা যায় ততটা তুলে প্রশ্ন করলেন ,” এটা কি ধরনের রসিকতা। কে ওই মেয়েটা?”
ভূপেনবাবুর পোড় খাওয়া চোখ। চশমার ফাঁক দিয়ে দেখে বললেন ,”মেয়েটাকে চেনা চেনা ঠেকছে। এই তুই নাজিয়া বানু না ?”
অঙ্ক স্যার বললেন,” তাই তো। এ যে নাজিয়া “
বিপ্লব শান্ত ভাবে বললো ,”ঠিক চিনেছেন। কয়েক মাস আগে এই মেয়েটিকে ইস্কুল থেকে বের করে দিয়েছিলেন মাইনে দিতে পারেনি বলে। দিন মজুর বাবা কেঁদে দু মাস সময় চেয়েছিলো। আপনারা দেননি। আর আজ পঁচিশ হাজার টাকা খরচা করে সরস্বতী পুজো করছেন। আমি ওই পুজোর টাকা দিয়ে ওর বকেয়া মাইনে মিটিয়ে বাকি টাকা ওর নামে ফিক্সড করে দিয়েছি। ওইটাকার সুদে ওর পড়াশুনোর খরচ চলে যাবে আর এই কদিন আমি আমার বাড়িতে রেখে ওকে পড়িয়েছি।”
ভূপেন বাবু চিৎকার করে উঠলেন ,”অধর্ম ! ঘোর অনাচার। এই মেয়ে স্কুলে থাকলে আমি অন্তত থাকবোনা। “
বাকিরাও বললেন ,”আমরা কেউ থাকবোনা। ”
এই বলে বেরোতে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন কারণ দরজায় ইন্সপেক্টর দাঁড়িয়ে। সাথে হেডমাস্টার সুধাময় বাবু ।
ইন্সপেক্টর ঘরে ঢুকে ভূপেন বাবুকে জিগেস করলেন ,”কি পড়ান আপনি ?”
-“আজ্ঞে সংস্কৃত ”
ইন্সপেক্টর এবার ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন,”তাহলে সংস্কৃত থেকেই প্রশ্ন করি ?”
এই বলে কয়েকটা তৎসম শব্দের ব্যুৎপত্তি জিগেস করলেন। পুরো ক্লাস চুপ। কেউ জানেনা। ভূপেন বাবু শীতকালে ঘামছেন। ইন্সপেক্টর তার দিকে তাকিয়ে বললেন ,”এরা কথা বলতে জানেনা ? না আপনি শেখাতে জানেনা?”
-“আমি পারবো ” মিহি গলায় কথাটা ভেসে এলো। নাজিয়া উঠে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক কঠিন ব্যুৎপত্তি অনায়াসে সে বলে যাচ্ছে। ভূপেন বাবু এমন হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন যে মাছি কেন আস্ত তিমি ঢুকে যাবে। বলা শেষ হলে ইন্সপেক্টর বললেন ,”কি নাম তোমার ?”
মেয়েটি চোখ নামিয়ে বললো “নাজিয়া বানু। বিপ্লব স্যার ডাকেন সরস্বতী বলে “
ইন্সপেক্টর সুধাময়ের দিকে ঘুরে বললেন,” সত্যি ও সরস্বতী। আমি একটু মজা করবো বলে বেশ শক্ত প্রশ্ন করেছিলাম কিন্তু ওই একরত্তি মেয়ে আমায় বেকুব বানিয়ে দিলো। ভালো সংস্কৃত মাস্টার পেয়েছেন।” এই বলে ভূপেন বাবুর কাঁধ ঝাঁকিয়ে ইন্সপেক্টর বেরিয়ে গেলেন।
জিপটা দূরে মিলিয়ে যেতে হেডমাস্টারকে বিপ্লব সব ঘটনা বললো। হেডমাস্টার ভূপেন বাবুকে বললেন ,”কি নাজিয়ার পড়া নিয়ে আর আপত্তি আছে? নাই হলো একবছর পুজো। একজনতো পড়াশুনো করে দাঁড়াতে পারবে। “
ভূপেন বাবুর চশমার ধার দিয়ে তখন জল গড়িয়ে পড়ছে। নাজিয়ার মাথায় হাত রেখে তিনি বললেন ,”পুজো হবে না কেন? আলবাত হবে। তবে এবার একটু অন্যরকম পুজো। এই প্রথম সরস্বতী পুজোতে আমি কুমারী পুজো করবো আর নাজিয়াই হবে আমাদের সরস্বতী !”
**********************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)
#SantanuStory

Copyright: Any adoption, publication, translation, film or any other form this story cannot be done without the proper approval of the author. Sharing is allowed with pleasure but with Author Credit.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *