হ্যাপি নিউ ইয়ার – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

*****************************************

হরিবাবু হিন্দু সমিতির অধক্ষ ছাড়াও পুরোহিত হিসেবে ভালো নামডাক আছে। যে সে পুরোহিত নয়। তাঁর প্রণামী বাবদ যে দর হাঁকেন সেটা সাধারণ মানুষ দিয়ে উঠতে পারে না। আর তাই তাঁর যজমানের তালিকায় শুধুমাত্র সমাজের কিছু বিত্তবান মানুষ। যাঁরা তাঁকে মার্সিডিজ গাড়ি করে পিক এন্ড ড্রপ দেন বাড়িতে পুজো থাকলে।

হিন্দু সমিতির অধক্ষ হবার ফলে ধর্ম প্রচার ব্যাপারটাও তাঁর কাজের মধ্যে পড়ে। বাড়িতে একসময় পেয়াঁজ রসুন পর্যন্ত ঢুকতোনা। এখন সে দুটি ছাড়পত্র পেলেও মুরগি নৈব নৈব চ।

এ হেন হরিবাবুর বাড়ি বছরের শেষ দিন ধুন্ধুমার কান্ড। ছোট ছেলে সুজন কাউকে না বলে বিয়ে করে হাজির হয়েছে। এইটুকুই তাঁর রক্তচাপ বাড়িয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল কিন্তু সেটা রীতিমতো হট্টগোলের জায়গায় এসে দাঁড়ালো যখন তিনি জানলেন তাঁর ছোটো ছেলের সদ্য বিবাহিত বৌ হিন্দু না। খ্রিস্টান।

“বেরো …….বেরো বাড়ি থেকে ” চিৎকার করে উঠলেন হরিবাবু। “প্রাণ থাকতে আমি এই অনাচার মেনে নেবোনা। ওপরে গিয়ে আমি রাধামাধবের কাছে কি মুখ দেখাবো ? হায় ঈশ্বর ! এ আমায় কি দিন তুমি দেখালে?”- হরিবাবু এই অবধি বলে একটা ব্রেক নিলেন ফুঁপিয়ে কাঁদার জন্য। হরিবাবুর স্ত্রী গিরিবালা দেবীও পুজোআচ্চা , ঠাকুর ঘর এসব নিয়েই থাকেন। কিন্তু মাতৃ স্নেহ ভীষণ জিনিস। তিনি হরিবাবুকে ক্ষীণ গলায় বললেন ,”কি আর করবে?হাজার হলেও ছেলে আমাদের। বংশের প্রদীপ। বৌমার গায়ে গঙ্গা জল ছিটিয়ে ঘরে তুলে নাও ”

-“কক্ষনো না। আমি এটা হতে দেব না। আমার একমাত্র পিসি রাজলক্ষ্মী দেবী খ্রিস্টান বিয়ে করেছিলো বলে আমার ঠাকুর্দা ত্যাজ্য কন্যা করেছিলেন। জীবনের শেষ দিন অবধি পিসির মুখ দেখেননি। সেই বংশের ছেলে আমি। কোনো ভাবেই মেনে নেবো না আর এই আমার শেষ কথা “- এক নিঃশ্বাসে বলে থামলেন হরি বাবু।

বড় ছেলে শিবেন মিনমিন করে বাবাকে বললো ,”ছোট ছেলে ভুল করে ফেলেছে ক্ষমা করে…….”। কথা শেষ করতে পারলোনা কারণ পেছন থেকে তার স্ত্রী মানু খোঁচা মেরে চুপ করতে বলছে। শিবেনের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে মানু বললো, “চিরকাল মাথামোটাই রয়ে গেলে। আপদ বিদায় হলে তো এই পুরো সম্পত্তি তোমার। সেটা ভাবো। ”

-“তা বটে…. তা বটে” বলে চুপ করলো শিবেন।

অবশেষে অনেক বাগবিতণ্ডা এবং পাড়ার লোকের হস্তক্ষেপের পরে ঠিক হলো ছোট ছেলে সুজন আপাততঃ মানে যতদিন বাড়ি খুঁজে না পায় ততদিন সিঁড়ির তলার ঘরে তেজ্য পুত্র হয়ে তার খ্রিস্টান বৌ সুজিকে নিয়ে আলাদা সংসার করবে।

সারাদিন বাড়িতে নানা রকমের গুঞ্জন শোনা গেলো। ছেলেকে মানুষ করার খামতি থেকে ধর্ম মাহাত্ম কিছুই বাদ পড়লোনা। হরিবাবু মাঝে মাঝেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন আর “হে রাধামাধব তুমি আমার অপরাধ নিওনা ” ইত্যাদি বিলাপ বাক্য।

এই সব হৈ হুজ্জুতির মধ্যে বছরের শেষ দিন ফুরোলো আর পরের দিন নতুন বছরের নতুন সূর্য উঠলো।

সুজন আর সুজি রাতের মশার কামড়ে ঘুমোতে পারেনি। সকালে দুজনেরই চোখ লেগে গেছিলো। হঠাৎ ওপর থেকে ভেসে আসা মায়ের গলায় কান্নার রোল শুনে ধড়মড় করে উঠে বসলো। খবর নিয়ে জানা গেলো হরি বাবু সকালে অভ্যেসমত মর্নিং ওয়াক করতে গেছিলেন কিন্তু এখনো ফেরেননি। বড় বৌমার ধারণা ছোট ছেলের এই হঠকারিতা সহ্য করতে না পেরে হরিবাবু বিবাগী হয়েছেন।

বেলা যখন প্রায় ১২টা তখন বড় ছেলে শিবেন বললো,”যাই থানায় একটা মিসিং ডাইরি করে আসি। না হলে পরে বাবার সম্পত্তি নিয়ে সমস্যা হবে।” শিবেন বেরোতে যাবে আর ঠিক সেই সময় একজন কোট প্যান্ট আর মাথায় হ্যাট পরা ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। গলায় দোদুল্যমান ক্রস লকেট বলে দেয় উনি খ্রিষ্টান ধর্মালম্বী।

ভদ্রলোককে বাড়িতে ঢুকতে দেখে শিবেন আর মানু “রে রে” করে তেড়ে উঠলো। শিবেন পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে মারমূখী মেজাজে বলে উঠলো ,” এই কে আপনি ? বলা নেই কওয়া নেই সিধে আমাদের বাড়ি ঢুকে পড়লেন যে “

ভদ্রলোক হ্যাটটা খুলে নাটকীয় ভাবে ঘুরে তাকিয়ে বললেন ,”ওরে আমি তোদের বাবা রে ”

বাড়ির সবার মুখ হাঁ হয়ে গেছে। ধুতি ফতুয়া ছাড়া যে মানুষ কোনোদিন কিছু পারেননি আজ এ তার কি হলো?

শিবেন বেশ রাগ মাখা অবিশ্বাসী গলায় বললো ,”আপনি আমার বাবা হরিবাবু হতেই পারেননা “

ভদ্রলোক আবার মুচকি হেসে বললেন,” হরি নয় হ্যারি। এখন এটাই আমার নাম। আজি চার্চে গিয়ে খ্রিস্টান হয়ে এলাম। ছোটবৌমা , সুজন আমায় ক্ষমা কর।” এই বলে স্ত্রী গিরিবালার দিকে তাকিয়ে বললেন,”ওদের বরণ করে ঘরে তোলো। আর শোনো খুব ক্ষিদে পেয়েছে। দুটো চিকেন স্যান্ডউইচ দিও তো।“

ঘরের ভেতর অপার্থিব নীরবতা। কি ঘটছে কেউ কিছু বুঝতে পারছেনা।

রহস্যেরঅবসান ঘটালেন ভদ্রলোক নিজেই।

নির্লিপ্ত মুখে হরিবাবু ওরফে হ্যারি বললেন ,” পিসি গত সপ্তাহে মারা গেছেন। প্রচুর সম্পত্তি বানিয়েছিলেন। সকালে ওনার উকিল এসেছিলো। উইলে অর্ধেক সম্পত্তি আমায় দিয়ে গেছেন। আজকের দিনে তার বাজার মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। একটাই শর্ত। আমায় খ্রিস্টান হতে হবে। আর না হলে সেই সম্পত্তি চার্চকে দিয়ে দেয়া হবে। হাতে সময় কম ছিল | উকিলবাবুকে নিয়ে সকালে সোজা চার্চে গিয়ে খ্রিস্টান হয়ে গেলাম। এখন দেড় কোটির মালিক এই হরি থুড়ি হ্যারি। এই টাকার কাছে ধর্ম টর্ম কোনো মানে রাখেনা। আজ নিউ ইয়ারে রাতে একটা বড় পার্টি দেব। ডেকোরেটর আর কেটারার ডেকে নিয়ে আয় তো শিবেন ”

কারো মুখে কোনো কথা নেই। সব্বাই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।

মৌনতা ভেঙে প্রথম প্রশ্ন করলো বড় বৌমা মানু।

“বাকি অর্ধেক সম্পত্তি কে পেলো ? সেটাও তো কম নয়”

হরিবাবু হাসিটা দ্বিগুন করে বললেন সেটাও এ বাড়িতেই আছে আর তার মালিক আমার ছোট বৌমা। নিঃসন্তান পিসিমা ওকে অনাথ আশ্রম থেকে এনে মানুষ করেছিল যে। সুজন যে মাঝে মাঝেই ওখানে যেত সেটা আমি জানতামনা।”

নতুন বৌ সুজি স্বামী সুজনের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললো ,”এবার বুঝলে, ঠাকুমা কেন বলেছিলো ওনার মৃত্যুর পরেই যেন আমরা বিয়ে করি |উনি জানতেন তোমার বাবা এই বিয়েটা মেনে নেবেনা। তাই এই প্ল্যান আগে থেকেই করে গেছিলেন। ”

সুজন শুধু মনে মনে বললো ,”বুড়ির কি বুদ্ধি রে বাবা ! যেখানেই থাকো ঠাম্মা তুমি আমার সেলুট নাও। উইশ ইউ এ ভেরি হ্যাপি নিউ ইয়ার আউট দেয়ার “

******************************************

শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

1.1.18

#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *