বড়দিন – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

*****************************************

সান্তাক্লোজ বলে আসলে যে কেউ নেই আর ক্রিস্টমাসের আগের রাতে বালিশের তলায় যে গিফটের আবদার করে বাচ্চারা শোয় সেগুলো যে তাদের বাবা মায়েরাই পূরণ করে সেটা কৃশানু ওরফে ডোডো জানলো এই সেদিন। স্কুলের বন্ধু দীপ্তদীপ একটু অকাল পক্ক গোছের। সেই সেদিন এই নির্মম সত্যটা জানিয়ে দিলো টিফিন টাইমে বেশ ঘটা করে। ক্লাসের বাকি বাচ্চারা সেই তত্ত্ব মেনে নিলেও ডোডো মন থেকে মানতে পারেনি আর তাই সে চ্যালেঞ্জ নিয়ে বসলো দীপ্তদীপের সাথে। তার স্পষ্ট বক্তব্য সান্তাক্লজ আছে আর সে নিজেই আসে গিফট দিতে।

দীপ্তদীপ একটা চতুর হাসি দিয়ে বললো ,”শোন আমিও তাই জানতাম। তবে গতবছর রাতে ঘুম ভেঙে গেছিলো। একটু চোখ ফাঁক করে দেখলাম বাবা বালিশের নিচে গিফট ঢোকাচ্ছে “

ডোডো তাও মানতে নারাজ। তার শিশু মন ভাবতে ভালোবাসে যে বাবা নয় সান্তাক্লজ নিজেই আসে। এর আগে অবধি সে যা চেয়েছে সান্তাক্লজ তাই দিয়েছে। এমন কি ওর সাধের ট্রাই সাইকেলটাও গতবার সান্তা বুড়োর উপহার ছিল। বাবা ডোডোকে বলেছে যে সে নিজে দেখেছে সান্তাক্লজকে সাইকেল চালিয়ে আসতে।

বাবা ডোডোর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। বাবা কক্ষনো মিথ্যা বলেনা।

ডোডো জোর গলায় বললো বাকি সব্বাইকে।

আরেক বন্ধু রাহুল বললো, “এবারেই তার পরীক্ষা হয়ে যাক !”

ডোডো জিগেস করলো “কিভাবে?”

দুবার ফেল করা রাহুল চমৎকার উপায় বললো।

-“এবার এমন জিনিস তুই সান্তাক্লোজের কাছে চাইবি যেটা তোর বাবার কাছে নেই ! সেই জিনিস যদি তুই পরদিন পেয়ে যাস তাহলে সান্তাক্লজ আছে আর না পেলে নেই !”

বুদ্ধিটা মনে ধরলো ডোডোর। পরদিন খ্রীষ্টমাস। কি নেই তার বাবার কাছে? অনেক বড় চাকরি করে তার বাবা। কোনো কিছু চেয়ে পায়নি আজ পর্য্যন্ত তা ঘটেনি! অনেক ভেবে হঠাৎ একটা জিনিসের কথা মনে পড়ে গেলো ডোডোর। এই জিনিসটা তো বাবার কাছে নেই। মনে মনে অনেকবার সে ভেবেছে বাবার কাছে এটা চেয়ে নেবে। । কিন্তু পারেনি। আজ সেই দিন। সান্তা ক্লোজের পরীক্ষা নেবার আদর্শ উপায়। রাতে বালিশের নিচে চুপি চুপি গিফটের নাম লিখে শুয়ে পড়লো ডোডো।

রাত বারোটায় ডোডোর বাবা সুতীর্থ আর মা মানালি এসে দেখল ডোডো গভীর ঘুমোচ্ছে। হাত ঢুকিয়ে গিফটের কাগজটা সাবধানে বের করে আনলো। তারপর নাইট ল্যাম্পের হালকা নীল আলোয় গিফটের নাম দেখে চমকে উঠলো দুজন| এটা যেন তারা প্রত্যাশাই করেনি। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো হাতে কাগজটা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। যে কাগজে লেখা আছে !

-“ ঠাম্মা“

_______________________________________

পরদিন সকালে সুতীর্থর মা বীণাপানি দেবী বাড়িতে প্রবেশ করলেন। মাঝে এক বছর কেটে গেছে বৃদ্ধাশ্রমের একটা ছোট্টঘরের চার দেয়ালের মধ্যে। তিনি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছেননা কি এমন ঘটলো যাতে যে ছেলে আর বৌমা যারা তাঁকে বৃদ্ধাশ্ৰমে রেখে এসেছিলো তারাই আজ সমাদরে বাড়িতে নিয়ে এলো নিজেদের ভুল স্বীকার করে।

ডোডো ঘুম থেকে উঠে বসার ঘরে গিয়ে দেখলো তার ঠাম্মা বসে। এক ছুটে ঝাঁপিয়ে পড়লো সে ঠাম্মার কোলে। আজ সত্যি তার কাছে “বড়দিন” ।ডোডো ঠাম্মাকে জড়িয়ে ধরে জিগেস করলো , “তোমাকে কি সান্তা ক্লোজ নিয়ে এলো ?” বীণাপানি দেবী হেসে বললেন ,” হ্যাঁ রে ! তোর বাবা সান্তা ক্লোজ সেজে আমায় নিয়ে এলো !”

বিকেলে খেলতে গিয়ে পার্কে দেখা হলো দীপ্তদীপ আর রাহুলের সাথে। পরীক্ষার ফল জানতে চাইলো তারা।

ডোডো মুচকি হেসে বললো ,”পরীক্ষা কাজে লেগেছে। আমি বুঝে গেছি আসলে সান্তাক্লজ সত্যি আছে। কোথায় জানিস ? সব বাবাদের মধ্যে| বাবারা চাইলে সব পারে। “

দীপ্তদীপ আর রাহুল হতবম্ভের মত তাকিয়ে রইলো।

*****************************************

শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *