লিকলিকেদা – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

*********************************

Profile2-“তোমার নাম কি খোকা ?”
পেছন থেকে ভেসে এলো প্রশ্নটা। হাবুল একটু দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকালো। একটা ঢ্যাঙা , রোগা লোক ওর দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটার মাথা জোড়া টাক আর ঘন কালো পুরু ভ্রু যেন মুখের মধ্যে একটা অপার্থিব ব্যাপার নিয়ে এসেছে।
ফ্যাসফ্যাসে গলায় লোকটা আবার জিগেস করলো ,”কি নাম তোমার ?”
হাবুল ক্লাস থ্রিতে পড়লেও সে জানে রাস্তায় যার তার সাথে কথা বলতে নেই। হাবুলের মা ওকে ছেলেধরার গল্প বলেছে। এই লোকটার ছেলেধরা হতেই পারে। হাবুল ভালো করে তাকিয়ে দেখলো লোকটার হাতে একটা থলে। ব্যাস ! আর সন্দেহ নেই। আজ সে একা একা খেলতে যাচ্ছে। ভূতোদা মানে ওদের বাড়িতে যে ছেলেটা ফাইফরমাশ খাটে সেও আজ আসেনি। নাহলে ভূতোদা ওর সাথেই যেতো। ইস ! ও থাকলে ছেলেধরা কিচ্ছু করতে পারতোনা। কিন্তু আজ হাবুল একা। ওর একটু ভয়েই করলো।
লোকটা এবার বেশ বিরক্ত হয়েই বললো
, “তুমি তো আচ্ছা বেয়াদপ ছেলে। এতো বার নাম জিগেস করলাম তাও বললেনা। সেই আমায় দিয়ে এখন অঙ্ক কষাবে। অঙ্ক কষলে আমার লিভারে চাপ পড়ে। ”
হাবুল এবার অবাক হয়ে বললো ,”অঙ্ক কষবে কেন ?”
লোকটা তার চেয়েও বেশি অবাক হয়ে বললো ,”অঙ্ক না কষলে কি করে তোমার নাম হাবুল বেরোবে ? অবশ্যি তুমি বলে দিলে ল্যাঠা চুকে যেত। আমাদের গ্রহের তাই নিয়ম। হয় স্বীকারোক্তি নাও নয় অঙ্ক কোষে বের করো। নাহলে কেউ মানবেই না “
“আমাদের গ্রহ। ” কথাটা কানে বাজলো হাবুলের। একটু কৌতূহল হওয়াতে সে জিগেস করলো ,”আমাদের গ্রহ মানে ?”
লোকটা মুখ দিয়ে একটা চুক চুক শব্দ বের করে বললো, “ এই দেখো। বলাই হয়নি। আমি অন্য গ্রহ থেকে এসেছি যে। পৃথিবী থেকে প্রায় দু হাজার আলোকবর্ষ দূরে আমাদের গ্রহ ‘ডুডেন ডু’ | অবশ্য ওটা আমাদের গ্রহের পৃথিবীর নাম। আমাদের গ্রহের নাম পৃথিবীর জল হাওয়াতে উচ্চারণ করা যায়না। যেমন ঠিক আমার নাম। ”
হাবুলের ব্যাপারটা বেশ মজা লেগেছে। সে আবার জিগেস করলো ,”কি নাম তোমার ?”
লোকটা বললো ,”বললামনা তুমি উচ্চারণ করতে পারবেনা। ”
হাবুল বললো বানান বললে , “আমি সব উচ্চারণ করতে পারি। তোমার নামের বানান বলো। “
লোকটা খ্যাক খ্যাক করে হেসে বললো ,” বিঃসর্গতে ঊকার, চন্দ্রবিন্দুতে রেফ আর হসন্তে দীর্ঘ ঈ। উচ্চারণ করো দেখি ?”
হাবুল হতবাক। লোকটা পাগল নাকি। এর উচ্চারণ সে কেন তাদের স্কুলের বাংলা ব্যাকরণের স্যার গোপালবাবুও পারবেননা।
লোকটাই সমাধান করে দিলো। সে বললো , “আমার পৃথিবীর নাম লিকলিকে। তুমি আমায় লিকলিকেদা বলে ডেকো। “
হাবুল এবার কিছুটা গোয়েন্দাদের মতো বললো ,” তুমি যদি অন্য গ্রহের লোক হও তাহলে তোমায় দেখতে একদম মানুষের মত কেন ?”
লিকলিকেদা হেসে বললো ,”আমরা যেখানে যাই সেখানে তাদের মত দেখতে হয়ে যাই। ঠিক জলের মত। যে পাত্রে ঢালবে জল তার আকৃতি নিয়ে নেয়। “
হাবুল বুঝলো ও পাগলের পাল্লায় পড়েছে।
-“আচ্ছা আমি আসি” বলে হাবুল পা চালালো |
কিন্তু সে যাবে কোথায়? লোকটা ততক্ষনে হাবুলের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে। হাবুল এবার বেশ ভয় পেলো। করুণ গলায় বললো ,” আমায় যেতে দাও।”
লিকলিকেদা বললো,” যেতে তো দেবোই। আমি তোমায় ধরে রেখে কি করবো ? তোমায় তো আমি আমাদের গ্রহেও নিয়ে যেতে পারবোনা। তুমি তো আর ‘বরিংস্লাউনহিচ্চি’ খেতে পারবেনা আর ‘পিঁচত্রিকী’ ভাষায় কথা বলতেও পারবেনা। না খেয়ে আর না কথা বলে তুমি থাকবে কি ভাবে ? “
লোকটা কি খাবার কথা বললো ? হাবুল অনেক ভাবেও পেলো না। আর ‘পিঁচত্রিকী’ ভাষাটাই বা কি ?লোকটা কি পাগল না কি ও যা বলছে সত্যি?
হাবুলের হঠাৎ একটা গল্প মনে পরে গেলো। ওর বাবার মুখে শোনা। “অঙ্ক স্যার গোলাপি বাবু ও টিপু।” সেই গল্পেও তো একই রকম ভাবে অন্য গ্রহ থেকে গোলাপি বাবু এসে টিপুর অঙ্ক স্যারকে পক্ষিরাজ ঘোড়ায় চড়িয়ে আচ্ছা জব্দ করেছিল। এই লোকটার কথাবার্তাও অনেকটা সেই ভিনগ্রহ থেকে আসা গোলাপীবাবুর মতো। কিন্তু সেতো গল্প। এখানে জ্বলজ্যান্ত একটা লোক দাঁড়িয়ে নিজেকে ভিনগ্রহের বাসিন্দা বলে দাবী করছে। এ নির্ঘাত ছেলেধরা। হাতের ওই ব্যাগটাতে যদি হাবুলকে ভরে পালায় কেউ জানতে পারবেনা।
লোকটা এবার হাবুলকে বললো ,” তোমার সামনে খুব বিপদ। আমি তোমায় বাঁচাতে এসেছি। শিগগিরি এই ঝোলায় ঢুকে পড়ো। তাহলে আর দুষ্টু লোকটা তোমায় খুঁজে পাবেন।”
ঠিক এই প্রস্তাবটার অপেক্ষাই হাবুল করছিলো। সে ওই ঝোলায় ঢুকলেই লিকলিকেদা চম্পট দেবে তারপর অনেক টাকা চাইবে ওর বাবার থেকে। হাবুল সব জানে।
ঠিক সেই মহুর্তে হাবুল দেখলো লোকটার পেছনে আর একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে। একে দেখে বুকে বল পেলো হাবুল। কারণ একে সে চেনে। হাবুলের ভূতোদা। হাবুলের দিকে লিকলিকেদা অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। হাবুল একবার ভাবলো ওর সদ্য শেখা ক্যারাটের কয়েকটা গুঁতো ঝেড়ে দেবে কিনা।
এসব ভাবতে ভাবতেই দেখলো ভূতোদাও একটা ব্যাগ বের করেছে। সেও এগিয়ে আসছে হাবুলের দিকে। ভূতোদার সামনে যে ওরম একটা লোক দাড়িয়াছে সেটা যেন সে গ্রাহ্যই করছেনা। যেন সে দেখতেই পাচ্ছেনা লোকটাকে। ভূতোদার দৃষ্টি সোজা হাবুলের দিকে। আর সেই দৃষ্টিতে একটা পরিবর্তন এসেছে। সেটা মোটেই ভালোবাসা বা ভরসার নয়।
লিকলিকেদা হাবুলকে বললো ,”ভূতো এসেছে তোমায় কিডন্যাপ করতে। তারপর তোমার বাবার কাছে মোটা টাকা চাইবে। কিন্তু তুমি ভয় পেওনা। আমি আছি তোমার সাথে।” এই বলে ভুতোর দিকে তাকিয়ে একটা ফুঁ দিলো। সেই ফুঁয়ে বাতাসের রং বেগুনী হয়ে উঠলো। তার স্পর্শ ভূতোর গায়ে লাগতেই সে প্রথমে মাটিতে বসে পড়লো। তারপর সে শুয়ে একটা গাছের গুঁড়িকে জড়িয়ে নাক ডাকতে শুরু করলো। হাবুল কি করবে বুঝতে পারছেনা। ও চোখে অন্ধকার দেখছে। হঠাৎ ও অনুভব করলো লিকলিকেদা হাতের ব্যাগটা ওর ওপর ফেলে দিয়েছে আর ও ঢুকে যাচ্ছে তার মধ্যে।
হাবুল জ্ঞান হারালো।
জ্ঞান হবার পর হাবুল দেখলো ও নিজের ঘরে খাটে শুয়ে। পাশে মা বসে। পায়ের কাছে ওর বাবা দাঁড়িয়ে ডাক্তার মজুমদারের সাথে কথা বলছে। হাবুলের জ্ঞান আসতে সবাই ছুটে এলো। হাবুলকে ওর বাবা বললো ,”ছাদে কি করছিলি। তুই তো খেলতে যাচ্ছিলি। আর অজ্ঞান হলি কি করে ?”
হাবুলের সব মনে পড়ে গেছে। ও এক দৌড়ে ছাদে গেলো। সেখানে ছাদের কার্নিশে ঝুলছে লিকলিকেদার হাতের সেই কালো ব্যাগ। সেটা খুলে মেলে ধরতেই হাবুল বুঝলো সেটা ঠিক ব্যাগ নয়। কিছুটা প্যারাসুটের মতো। এই ছবি সে আগে দেখেছে। কিছুদিন আগে কাগজে ছবি বেরিয়েছিল। উত্তর রাশিয়াতে এমনই একটা প্যারাশুট পাওয়া গেছে। সেই প্যারাশুট পরীক্ষা করে বৈজ্ঞানিকরা বলেছে যে সেটা পৃথিবীর বাইরে থেকে এসেছে। তার কাটিং এখনো তার পড়ার টেবিলের দেরাজে আছে।
হাবুল ওর বাবাকে সব বললো। শুনে হাবুলের বাবা সেখানে যেতে চাইলো সত্যতা যাচাই করার জন্য। সাথে গেলো হাবুল আর ডঃ মজুমদার |
জায়গাটায় পৌঁছে ওরা দেখলো ভূতো তখনো নাক ডাকছে। ওর পকেটে একটা শিশি উঁকি মারছে। হাবুলের বাবা সেটা বের করে ,ঢাকনা খুলে নাকে ঠেকালো। তারপর এগিয়ে দিলো ডঃ মজুমদারের দিকে। তিনিও শুঁকলেন। গন্ধটা তাঁর চেনা। চশমার ওপর চোখ তুলে ডঃ মজুমদার বললেন ,” ক্লোরোফর্ম। কিডন্যাপিং কেস বলেই মনে হচ্ছে। পুলিশে খবর দিন। দুটো রুলের গুঁতো পড়লেই ঘুম থেকে উঠে সব স্বীকার করবে।”
*********************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *