​ফটিকের স্বর্গ যাত্রা – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

************************************************************************************************************

                                                                                       ———- ১ ———-

Myself1সুদখোর মহাজন ফটিক লাল হালদারের অকস্মাৎ সেরিব্রাল স্ট্রোক হওয়াতে কিছু লোক দুঃখ পেলেও বেশির ভাগ মানুষই আনন্দ পেয়েছিলো আর মনে মনে তার শীঘ্র মৃত্যু কামনা করছিলো। ঘরে ঘরে পুজো , বাবার থানে মানত , গাছে সুতো বাঁধা সবই চলছিল প্রবল বেগে। প্রার্থনা একটাই “ফটিক মহাজনকে তুলে নাও।”
দিনমজুর বলাই সবচেয়ে উৎকণ্ঠায় আছে। রোজ ঠাকুরের সামনে ধুপ নাচায় আর বলে ,” দেখো মা ফটকে যেন এ যাত্রায় ফিরতে আর না পারে “
এতো অভিশাপ বুকে নিয়ে কেউ বাঁচতে পারেনা। তাই একদিন ডাক্তার তাকে জবাব দিয়ে দিলো। মহাজনের বাড়িতে সানাই সুরে কান্নার রোল উঠলো।
ফটিকের ছেলে কেস্ট ভেন্টিলেটরে শায়িত প্রায় মৃত বাবার দিকে তাকিয়ে মুখ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে মাথা নাড়ালো আর মনে মনে বাবার সম্পত্তির হিসাব কষলো। যদিও এ সব সম্পত্তিতে অনেকের চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাস জড়ানো তাতে কেষ্টর কিছু আসে যায়না। বাবার মত সেও রক্তশুষে অন্যের সম্পত্তি ছলে বলে কৌশলে আদায় করার বিদ্যায় নিপুণ দক্ষতা অর্জন করেছে। অনেকের মত সেও অপেক্ষা করছে ফটিকের মৃত্যুর। যদিও তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। রাতটা ফটিকের কাটলে হয়।
                                                                                          ———- ২ ———-
ফটিক এসে দাঁড়ালো দুটো বিরাট বন্ধ দরজার সামনে। শরীরে আর তেমন কোনো কষ্ট নেই। দরজার বাইরে থেকে ভেতরে দেখা যায়। ভেতরে একটা সুন্দর বাগান।হরেক রকমের গাছ। নানা রকমের পাখি। সোনার হরিণ চরে বেড়াচ্ছে। একদল সুন্দরী রমণী বিকেলের মৃদু বাতাসে আঁচল উড়িয়ে , একরাস মুক্ত ঝরানো হাসির ঢেউ তুলে সামনে দিয়ে চলে গেলো। ফটিক দৌড়ে ঢুকতে গিয়ে দেখলো গেটে তালা দেয়া আর সাইন বোর্ডে লেখা – স্বর্গ ভবন – গেট নং ৭
দুজন তাগড়াই দারওয়ান টুলে বসে খৈনী ডলছে। ফটিকের আর তর সইছেনা। স্বর্গ এতো সুন্দর তবুও লোকে মরতে ভয় পায় ? ফটিক মনে মনে ভাবলো। একজন দারোয়ানকে ডেকে বললো , “ ও দারোয়ানজি। গেট খুলকে আমায় ভিতরে ঘুষনে দো।“
দারোয়ান গোঁফে তা মেরে বললো ,”অভি হুকুম নাহি হ্যায় ”
ফটিক বললো, “ যা বাব্বা , হুকুম কে দেবে আবার ?”
দারোয়ান জানালো একটু পরেই চিত্রগুপ্ত স্যার আসবেন। তিনি এসে অর্ডারে সই করবেন। ততক্ষন বাইরে অপেক্ষা।
                                                                                     ———- ৩ ———-
একটু পরে একজন সাদা দাড়ি গোঁফওয়ালা বুড়ো এসে দাঁড়ালো। হাতে একটা লাল মলাটের খাতা আর একটা পেন্সিল। এক এক করে সে নাম ডাকছে আর দারোয়ান সেই লোকটিকে ঢুকিয়ে নিচ্ছে। লোকটি ঢুকে গেলে বুড়ো পেন্সিল দিয়ে খাতায় টিক দিয়ে নিচ্ছে।
ফটিক বুঝলো ওই চিত্রগুপ্ত। একএক করে সবাই ঢুকে গেলো। ফটিক ছাড়া। চিত্রগুপ্ত খাতা বন্ধ করে ,পেন্সিল কানে গুঁজে যেমনি পেছন দিকে ঘুরেছে অমনি ফটিক , ও স্যার। .. ও চিত্রগুপ্ত স্যার “ বলে হুড়মুড়িয়ে গেটে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
চিত্রগুপ্ত সচকিতে পেছনে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বলে উঠলো ,” এই তুই কে রে ?”
ফটিক বললো , “ আজ্ঞে আমি ফটিক লাল হালদার “
চিত্রগুপ্ত খাতা খুলে ভালো করে দেখে বললো ,”তোর নাম ছিল কিন্তু এখন কাটা দেখছি। এ মাসের টার্গেট মিট হয়ে যাওয়াতে লাস্ট মোমেন্টে কটা নাম বাদ গেছে। বাকি গুলো ব্যবস্থা হলেও তোরটা মিস হয়ে গেছে। ”
ফটিক প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, “এসেছি যখন ,তখন আর ফিরে যাবোনা।যে ভাবে হোক আমায় ঢুকিয়ে নিন। “
চিত্রগুপ্ত ভাবলো ঢুকিয়ে নেয়াই ভালো আবার কিসের থেকে কি হয়ে যায়। ফটিক স্বর্গে ঢুকে পড়লো।
                                                                                             ———- ৪ ———-
ফটিককে ভালো করে পরীক্ষা করে ডাক্তার বললো ,”ব্রেন ডেথ।” মৃত ডিক্লেয়ার করা এবার সময়ের অপেক্ষা।
ছেলে কেস্ট দৌড়োলো উকিলের বাড়ি সব কাগজ পত্র নিয়ে। বলাই বাড়িতে হরি লুট দিলো। তার জমি বাড়ি বেঁচে গেছে। সময় মত পাওনা টাকা দিতে না পারার জন্য কালই তার বাড়ির দলিল নিয়ে ফটিকের সাথে দেখা করার কথা ছিল। মনে হচ্ছে এ যাত্রায় বেঁচে গেলো।
ফটিকের ছেলে কেষ্টাকে নিয়ে বলাইয়ের বিশেষ চাপ নেই। সে নিজেই বলাইয়ের মেয়ে মানুকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলো। ফটকে রাজি হয়নি। এবার ফটিক পটল তুললেই বলাই বিয়েটা পাকা করে সব দেনা মাফ করিয়ে নেবে। বলাইয়ের আনন্দ ধরেনা। লুকিয়ে লুকিয়ে তিন গ্লাস তাড়ি পান করে এখন দালানে বসে মৌতাত করছে। আনন্দে আর উত্তেজনায় তার বুকটা আজ একটু বেশী জোরেই ধক ধক করছে। ফটিকের মরার খবরটা একবার এলে হয়।
                                                                                                 ———- ৫ ———-
ফটিক স্বর্গে ঢুকে দেখলো সে একটা অপরিষ্কার ও আবছা অন্ধকার জায়গায় দাঁড়িয়ে। দূরে এখনো পারিজাত বন , স্বর্ণ মৃগ আর অপ্সরাদের লাস্যময়ী আনাগোনা দেখা যাচ্ছে কিন্তু ফটিক যেতে চেয়েও ওখানে যেতে পারছেনা।
অথচ ওই সব দেখেই সে স্বেচ্ছা মৃত্যু বরণ করেছে। এখন সেই উদ্দেশ্য সফল না হলে তার আত্মত্যাগ বেকার হয়ে যাবে। সে এই সব মনে ভাবছে আর ঠিক সেই সময় ষণ্ডা মার্কা ,লাল চোখওয়ালা ৯ফুট ৮ ইঞ্চি লম্বা একটা লোক এসে দাঁড়ালো। হাতে একটা বাটি। ফটিককে বললো ,”জামা খোল !”
ফটিক চমকে উঠে বললো ,”কেন ? জামা কেন খুলবো?”
লোকটা সাড়ে সতেরোটা দাঁত একসাথে বের করে হাতের বাটিটা দেখিয়ে বললো ,” তোকে মাখবো “
ফটিক ঘাবড়ে গিয়ে বললো ,”কি আছে ওই বাটিতে ?”
লোকটা একই রকম হেসে বললো ,”আদা বাটা ,রসুন বাটা , দু টি স্পুন সর্ষের তেল সাথে ধনের গুঁড়ো , জিরের গুঁড়ো ,আন্দাজ মত নুন আর…”
-“ কি হবে এ গুলো দিয়ে ?” লোকটা কথা শেষ করার আগেই উৎকণ্ঠায় জিগেস করে উঠলো ফটিক।
লোকটা গলা নামিয়ে বললো, “তোকে এখন দুদিন ধরে ম্যারিনেট করে রাখবো। তারপর তিন দিন তিন রাত গেলে ওই যে টি এম টি বার গুলো দেখছিস ,ওগুলোতে তোকে গুঁজে তান্দুরি বানাবো। সেরকমই নির্দেশ আছে ”
ফটিক ডুকরে কেঁদে উঠলো।
কাঁদতে কাঁদতেই জিগেস করলো ,”ওই বাগানটায় যাবোনা ?”
লোকটা এবার হোহো করে হেসে বললো ,”এখানে কোনো বাগান নেই। গেট ১ থেকে ৫ হলো বাগান। তুই যেটা দেখছিস ওটা সিসি টিভি ফুটেজ। সব গেটেই লাগানো আছে। স্ক্রিনটা বিশ্বকর্মা বাবু নিজে হাতে বানিয়েছেন আর তাই এতো নেচারাল।”
ফটিক বুঝতে পেরেছে ও ভয়ানক বাজে ভাবে ফেঁসে গেছে। সিসি টিভির ফাঁদে পা দেয়া উচিত হয়নি। গেট ১-৫ হলো পুণ্যাত্মাদের জন্য আর ৬-১৫ হলো পাপীদের। পাপীদের শাস্তি আগে হয়। গরম তেলও কারো কারো ভাগ্যে জোটে। ফটিকের পাপের বোঝা কিছু কম নয়।
বহু লোককে ঠকিয়ে তাদের সম্পত্তি বাগিয়েছে ফটিক। আজ সেই পাপের ফল ভোগ করার দিন। ফটিক উপায়ন্তর না দেখে “ও চিত্রগুপ্তদা .. বাঁচাও বাঁচাও “ করে কান্না জুড়লো। চিত্রগুপ্ত হন্তদন্ত হয়ে এসে হাজির। সব শুনে সে বললো ,” কি করবি বল ফটিক। যদি কিছু পুণ্যি করে আসতিস তাও একটা চেষ্টা করে দেখতাম। কিন্তু তুই তো সে উপায়ও রাখিসনি। ফটিক ভ্যাঁ করে বললো ,”আমায় তবে ফেরত পাঠিয়ে দাও। কথা দিচ্ছি মহাজনি কারবার ছেড়ে দান ধ্যানে মন দেব। ”
চিত্রগুপ্ত দাড়ি চুলকে বললো ,” কি করে ছাড়ি বল ? একবার ঢুকে পড়লে বেরোনো যায়না। আমি তো ঢুকতে বারণ করলুম। তুই তো জোর করলি। “
ফটিক বললো তখন কি বুঝেছিলাম যে ওই স্বর্গের বাগান তোমরা সিসি টিভিতে চালিয়েছো ? বলছি হাতের এই হীরের আংটিটা নাও। তোমার লম্বা আঙুলে দারুণ মানাবে। আমায় ছেড়ে দাও “
চিত্রগুপ্ত কি একটা ভেবে বললো ,” বলছিস ? মানাবে। দে তাহলে। “
তারপর ঘুরে ওই লম্বা লোকটাকে বললো ,”রিপ্লেস হবে। পরের নামটা যার তাকে নিয়ে আয়। ওকে ছেড়ে দে। ”
লম্বা লোকটা নিমেষে আর একজনকে এনে হাজির করলো। তাকে দেখে চমকে গেলো ফটিক ! এ যে বলাই!!!
বলাই কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু তার আগেই এক লাফে ৭ নম্বর গেট টপকে ছুট লাগলো ফটিক।
                                                                                              ———- ৬ ———-
ভেন্টিলেটরে নড়াচড়া দেখে নার্স দৌড়ে ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনলো। ফটিকের জ্ঞান ফিরেছে। ব্রেন ডেথ ভাবাটা ভুল হয়েছিল। ছেলে কেষ্টকে খবরটা দিতে সে উহু উহু করে আফসোস করতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো। ১৫ মিনিটের মধ্যে উঠে বসলো ফটিক । এক গ্লাস গরম দুধ খেয়ে সে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ডাক্তারকে বললো “বাড়ি চললুম”। এই বলে গট গট করে সে বেরিয়ে গেলো। ডাক্তার হতবম্ভের মতো তাকিয়ে রইলো। চিকিৎসা শাস্ত্রে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই।
বাড়ি যাবার পথে ফটিক হাজির হলো বলাইয়ের বাড়ি। সেখানে ভয়ানক কান্না। অতি উত্তেজনায় ও তাড়ির বিষক্রিয়ায় কিছুক্ষন আগে মারা গেছে বলাই। দেহটা উঠোনে শোয়ানো। বলাইয়ের মেয়ে মানু ফটিকের পায়ে আছাড় খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো ,” কার কাছে আর দলিল নেবেন। বাবা নেই “
ফটিক স্বস্নেহে মানুকে তুলে কাছে টেনে বললো ,”ভাবিসনা। আজ থেকে আমি তোর বাবা। খুব শিগগিরি কেস্ট আর তোর বিয়ে দেবো “
                                                                                                   ———- ৭———-
তারপর থেকে অনেক দিন কেটে গেছে।কেস্ট আর মানুর বিয়ে হয়েছে। ফটিক মহাজনি কারবার ছেড়ে প্রায় সন্ন্যাস নিয়েছে। যার যার দলিল জমা নিয়েছিল সব ফিরিয়ে দিয়েছে। নিজের গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে অবৈতনিক বিদ্যালয় থেকে শৌচাগার সবই বানিয়ে দিয়েছে। সকালে দীন সেবা করে আর রাতে হরি সংকীর্ত্তন করে। লোকে এখন মহাজন ফটিক কে দানবীর ফটিকলাল বলে ডাকে। ছেলেটাও শুধরে গেছে।
সেদিন রাতে বুকে ব্যথা। ফটিক বাড়ির উঠোনে পড়ে চন্দ্রবিন্দু প্রাপ্তি হলো। আবার এসে দাঁড়ালো বন্ধ গেটের সামনে। সুন্দর বাগান। সোনার হরিণ আর অপ্সরীদের আনাগোনা। তবে এবার গেট নং ২।
ফটিকের মনে পড়ে গেলো। আগের বার সে শুনে গেছিলো গেট নং ১-৫ হলো স্বর্গের বাগানের। পুণ্যবানদের জন্য। চিত্রগুপ্ত নাম ডাকতেই দারোয়ানের জায়গায় একজন সুন্দরী রমণী দরজা খুলে দিয়ে বললো ,”স্বর্গ রাজ্যে স্বাগত। আমার নাম রম্ভা। অনেকটা পথ এসেছেন। আসুন আপনার বিশ্রামকক্ষ দেখিয়ে দি “
********************************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)
#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *