ক্ষুধিত জীবন – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

*************************************

Santanu Mukherjee (Joy)

““এই যে মশাই শুনছেন ?”

কথাটা কানে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন সুকোমল শিকদার। আজকাল গল্প লিখিয়ে হিসেবে মোটামুটি ভালোই নাম করেছেন। বিশেষত ভূতের গল্পে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ছাপার অক্ষর যে কারো মনে এভাবে ভয়ের সঞ্চার করতে পারে তা সুকোমল বাবুর লেখা যে পড়েনি, সে বুঝবেনা। তাঁর সর্বশেষ লেখা গল্প “ডাইনির সাথে এক রাত ” পড়ে এক ভদ্রলোক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বাড়ির লোকেরা লেখকের বিরুদ্ধে থানায় এফ আই আর পর্যন্ত করেছিল যদিও সেটা ধোপে টেকেনি। সে গল্প “প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য ” তকমা লাগিয়ে পুনঃ প্রকাশিত হয়েছিল। এখন রাস্তা ঘাটে লোকে দেখলে তাঁকে চিনতে পারে। মাঝে মাঝে সই টই এর আব্দার-ও আসে। সুকোমল সেগুলো হাসি মুখে মেটান।
আজকের এই ডাকটা শুনে একটু অবাক হলেন তিনি। কারণ এই জায়গাটা কোলকাতা শহর নয়। উড়িষ্যার বালাসোরের কাছে সমুদ্র সৈকত চাঁদিপুরে এসেছেন দিন কতক হলো। উদ্দেশ্য হলো একটু নিরিবিলি জায়গায় এসে পরের গল্প লেখা।
গল্পটা ফেঁদেছেন বেশ ভালো। নাম রেখেছেন “ক্ষুধিত জীবন। ” গল্পে একটা বাড়ির কথা আছে যে বাড়িটা সবাইকে গ্রাস করে নেয়। দুই বন্ধু বাজি ধরে সেখানে রাত কাটাতে যাবে আর তার মধ্যে একজনকে একটা ফটোফ্রেম গ্রাস করে নেবে। ওপর বন্ধু তাকে খুঁজে না পেয়ে সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়াবে আর তারপর হঠাৎ দেখবে একটা বিশাল ফটোফ্রেমে যেখানে শুধু সে বাড়ির মালিকের ছবি ছিল এখন সেখানে দুজনের ছবি। আরেকজন তার বন্ধু দেবাংশুর। জলজ্যান্ত দেবাংশুকে ফটোফ্রেম গ্রাস করে নিয়েছে।
যেটা এখনো হয়নি সেটা হলো অন্য বন্ধুটির নাম ঠিক করা। ওই জায়গাটা ফাঁকা রেখে গেছেন। ফলে পান্ডুলিপিটা দেখতে একটু খাপছাড়া গোছের হয়েছে।
আজ ওই নামটা ভেবে বের করবেন। এই সংকল্প নিয়ে সমুদ্রের ধরে হাঁটতে বেড়িয়েছেন সুকোমল।
আগন্তুকের ডাকে ঘুরে তাকালেন।
আগন্তুক একটা ছোট্ট নমস্কার করে বললো , “ক্ষুধিত জীবনটা আর লিখবেননা “
সুকোমল বেশ অবাক হয়ে বললেন ,”মানে ? লিখবোনাই বা কেন আর আপনি জানলেন কি করে যে আমি ক্ষুধিত জীবন লিখছি ?”
লোকটি বেশ অবাক হয়ে বললো , “সেকি মশাই ! কাল আপনি আপনার হোটেলের ম্যানেজার অমিয় বিশ্বাস কে পড়াননি ?”
সুকোমল বাবু বেশ হতবম্ভের মতো বললেন , “সে পড়িয়েছি ! কিন্তু আপনি কি করে জানলেন ? মানে তখন তো আর কেউ ধরে কাছে ছিলোনা “
লোকটি এবার ডানদিকের ভ্রু তুলে বেশ শ্লেষ মেশানো ভঙ্গিতে বললো , “সেটা আপনার না জানলেও চলবে। ম্যানেজার আপনাকে ওই গল্পের চরিত্রটির তিনটে নাম সাজেস্ট করেছে। একটাও নেবেননা। নিলেই ঘোর বিপদ। আরেকজনের নাম মানে যাকে ওই ছবির ফ্রেম গিলে নিলো তার নাম ‘দেবাংশু’ রেখে অলরেডি একটা কেলেঙ্কারি করেছেন। বিপদ আর বাড়াবেননা। তার থেকে লেখা বন্ধ করুন।”
এবার সুকোমল বুঝলেন লোকটা পাগল। নির্ঘাত একই হোটেলে উঠেছে আর সে যখন ম্যানেজেরকে পড়ার জন্য ম্যানুস্ক্রিপ্টটা দিয়ে গেছিলো তখন কোনো ভাবে সে নিয়ে পড়েছে।
সুকোমল একটু কঠিন গলায় বললেন , “ উপদেশ দেবার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু এটা আমার রুজি রুটি কিনা। তাই আপনার কথা রাখতে পারলামনা।”
লোকটা এবার একটা কঠিন দৃষ্টি নিয়ে রুক্ষ গলায় বললো “দেবাংশুর তাহলে ফটোফ্রেম থেকে মুক্তি নেই?”
-“না ” বলে পা চালালেন সুকোমল।
দূরে শুনলেন লোকটা চিৎকার করে বলছে , “কাজটা ঠিক হলোনা কিন্তু। দেবাংশু এর প্রতিশোধ নেবে। সবাই আমার মতো নিরীহ হয়না যে সমুদ্রের ধারে খুন করে বালিতে পুঁতে দেবার পরেও সে খুনিকে ক্ষমা করে দেবে।এই সুহাস মল্লিকের কথাটা মনে রাখবেন “
থমকে দাঁড়ালেন সুকোমল। সুহাস মল্লিক ! এ নামটা তাঁর চেনা। তারই গল্পের চরিত্র। গল্পের নাম “রক্তাক্ত সমুদ্র। ” এই গল্পই তাঁকে ভূতের গল্প লেখক হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছিলো। সুহাস মল্লিক নামটা এক পরিচিতর থেকে ধার করা। কাকতলীয় ভাবে এই গল্প লেখার পর সেই সুহাস মল্লিকের রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয়। দেবাংশু নামটাও ধার করেছেন তাঁর এক কলেজের সহপাঠীর নাম থেকে।
চমকে পিছনে তাকালেন সুকোমল। কেউ নেই। শুধু সমুদ্রের লোনা হাওয়াতে গাছগুলো দুলছে।
হোটেলে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে আবার লেখায় মন দিলেন সুকোমল। নাঃ দ্বিতীয় বন্ধুর নাম এখনো ঠিক করতে পারেননি।
মনে মনে ভাবলেন লেখাটা আগে শেষ করা যাক। দ্বিতীয় বন্ধুর নাম পরে ভেবে চিন্তে দেবেনখন। বিশেষ করে যখন দ্বিতীয় বন্ধুর পরিণতি আর গল্পের শেষ তাঁর ভাবা হয়ে গেছে। তখন আর ফেলে রেখে লাভ নেই।
গল্প শেষ হবার প্রায় সাথে সাথেই মোবাইলটা বেজে উঠলো। কলকাতা থেকে অবিনাশ ফোন করেছে। সুকোমলের কলেজের সহপাঠী।
-“সুকোমল ! অবিনাশ বলছি “
-“বল ”
-“একটা বাজে খবর আছে ”
-“কি?”
-“ কাল রাতে দেবাংশু রহস্যজনক ভাবে মারা গেছে ”
-“সে কি রে ?”
– “আর বলিসনা। ওর বাড়িতে যে বড়ো অয়েল পেন্টিংটা ছিল ওর নিচে পড়েছিল। ডাক্তার কিছুই কারণ বুঝতে পারছেনা। ”
ফোনটা কেটে দিলেন সুকোমল। ওঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
এটা কি আবার কাকতলীয় ? দেবাংশুর জীবনেও একই পরিণতি নেবে এলো যেমন তিনি গল্পে ভেবেছিলেন? এর পর ? এর পর কি হবে ?
“ক্ষুধিত জীবন “ গল্পের শেষে তিনি লিখেছেন দ্বিতীয় বন্ধু সেই রহস্যময় বাড়ির একটা বইয়ের প্রচ্ছদের সাথে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাবে। যে বইয়ের প্রচ্ছদে একটি ছবি ছিল সেখানে দুটো ছবি হয়ে যাবে। কিন্তু কি নাম দেবেন এই দ্বিতীয় বন্ধুর। যে নামই দিন না কেন সেই নামে যদি কেউ থেকে থাকে তবে তার জীবনেও কি একই পরিণতি নেবে আসবে ?
কলমটা খাতায় ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন সুকোমল। তাঁর হৃদপিন্ড দ্বিগুন জোরে চলছে।
হঠাৎ একটা হ্যাঁচকা টান অনুভব করলেন তিনি। কেউ তাঁকে যেন হাত ধরে টানলো। তবে সেটা বাইরে নয়। খাতার মধ্যে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলেন তাঁর কব্জি অবধি খাতার মধ্যে ঢুকে গেছে।সে খাতা যেন আর খাতা নেই। বিরাট এক কৃষ্ণগহ্বর যা তাঁকে টানছে। প্রানপনে বাধা দেবার চেষ্টা করলেন সুকোমল। কিন্তু না ! সে রাক্ষুসে খাতার টানের কাছে তাঁর সব শক্তি কম মনে হলো। যেমন চোরাবালিতে একটু একটু করে মানুষ ডুবে যায় তেমন সুকোমল খাতার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছেন। তাঁর “বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুধু ব্যর্থ প্রতিধ্বনি হয়েই ফিরতে লাগলো।
মাথাটুকু সমেত পুরো শরীর ঢুকে যাবার আগে সুকোমল দেখলেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে তাঁর কলেজের সহপাঠী সদ্য প্রয়াত দেবাংশু আর আজ আলাপ হওয়া সেই পাগল সুহাস মল্লিক।
পরদিন খবর রটে গেলো বিখ্যাত সাহিত্যিক সুকোমল শিকদার মিসিং। থানা পুলিস হলো। ঘরে শুধু মাত্র একটা গল্পের পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেলো। খাতার ওপর বড় বড় করে লেখা “ক্ষুধিত জীবন। ”
হোটেল ম্যানেজার অমিয় বাবু হাতে খাতাটা নিয়ে পাতা উল্টেই চমকে গেলেন। গল্পটি শেষ করা হয়েছে দ্বিতীয় বন্ধুর বইয়ের মধ্যে মিলিয়ে যাওয়া দিয়ে।
দ্বিতীয় বন্ধুটির নামটাও দেয়া আছে সেই গল্পে আর সেই নামটা হলো “সুকোমল শিকদার ”।
আর সেটা অন্য একজনের হাতের লেখায় লেখা।
**************************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )
#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *