কুসুম নামে মেয়েটা – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

******************************************

IMG_1213-“তোর নাম কি রে ?”
-“ কুসুম “
– “থাকিস কোথায় ?”
-“হুই লাইনের ওপারে ইস্টিশন মাষ্টারের ঘর। ওর পাশে“
-“এখানে কি চাস ?”
-“বল খেলা দেখবো ”
-“সে তো দুপুরে ”
-“জানি ”
-“তাহলে এখন কি করছিস ?”
-“তোমায় দেখতি এয়েচি ”
-“আমায়?”
– “হুঁ “
-“পচাই বললো তুমি কোলকেতেতে কেলাবে খেলো। “
-“তাতে কি হয়েছে ? তোকে পচাই বললো আর অমনি তুই দেখতে চলে এলি ? ঠিক করে বল কি মতলব তোর? চুরি করার তাল নাকি রে ?”
-“না বাবু। বিশ্বাস করেন। মাইরি বলছি ”
-“ঠিক আছে। যা ভাগ !”
মেয়েটা চলে গেলো। বছর দশেক বয়েস হবে। গলার আওয়াজ না শুনলে ছেলে বলেই ভুল হয়। ছোট ছোট করে ঘাড়ের ওপর কাটা চুল। পরনে একটা খাকি হাফ প্যান্ট আর একটা ময়লা লাগা স্পোর্টস টি শার্ট যেটার রং একসময় সাদা ছিলো।
আমার নাম অসিত বিশ্বাস। ফুটবলার। কলকাতার এক ফার্স্ট ডিভিশন ক্লাবে রাইট ব্যাকে খেলি। সিজিনে ময়দান কাঁপাই আর অফ সিজনে খেপ খেলি। এই গ্রামে তেমনি খেপ খেলতে আসা। হরিনাথ মেমরিয়াল ক্লাব আমায় ভাড়া করে এনেছে রেল কলোনি একাদশের সাথে ফাইনাল খেলার জন্য।
কলকাতার ক্লাবে খেলি বলে আমার খাতির একটু আলাদা। আমার নাম করে প্রচার চলছে। দুপুরে মাঠে পৌঁছে দেখি দর্শকের ভীড় উপছে পড়ছে। গোলকিপার রতন বললো বেশিরভাগই নাকি এসেছে আমার খেলা দেখতে। নিজের মধ্যে একটা প্রত্যাশার চাপ অনুভব করলাম।
দুপুর দুটোয় শুরু হলো খেলা। হরিনাথ মেমোরিয়াল মানে আমাদের দল শুরু থেকেই চেপে ধরেছে গত দুবারের চ্যাম্পিয়ন রেল কলোনিকে। দেদার ফাউল হচ্ছে আর এর মধ্যেই আমি একটা গোল করে ফেললাম।
আমি ব্যাকে খেলি। গোল করার থেকে গোল বাঁচানোই আমার কাজ কিন্তু এখানে ওসবের কেউ ধার ধারেনা। আমি যখন সেন্টার লাইন থেকে বল ধরে ৫ জনকে কাটিয়ে গোলটা করলাম তখন নিজেকে সেই ছিয়াশির মারাদোনা ছাড়া আর কিছু মনে হলোনা। লোকেরাও উৎসাহে চিৎকার করছে আর সেই চিৎকার থামার আগেই আরেকটা গোল করে ফেললাম আমি।
খেলার সময় কুড়ি মিনিট পেরিয়েছে। আমরা ২-০ তে এগিয়ে। এমন সময় ওরা একটা বদল করলো। ওদের সবচেয়ে ভালো প্লেয়ারে সেন্টার ফরওয়ার্ড ফনি পড়ে গিয়ে মালাইচাকি ভাঙলো আর তার পরিবর্তন হিসেবে যে নামলো তার মুখের থেকে গোঁফ বড়।
আমাদের ক্লাবে ফিসফিস শুরু হয়ে গেছে। নির্ঘাত ভাড়াটে প্লেয়ার। গ্রামে কেউ ওকে আগে দেখেনি !রেল কলোনির কন্টাক্ট সাংঘাতিক রকমের। কোনোভাবে সেগুলো কাজে লাগিয়ে ওরাও প্লেয়ার এনেচে .
খেলা আবার শুরু হলো। নতুন ছেলেটার গতি দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম। এর মাঝেই গোল ! না আমরা নয়। একগোল শোধ করে দিয়েছে সেই গোঁফওয়ালা ছেলেটা। এরপর একই ভাবে দ্বিতীয় আর তৃতীয় গোল। ছেলেটার পায়ে বল থাকলে আমি কেমন যেন অসহায় বোধ করছি। আর আমায় নাস্তানাবুদ করে ছেলেটি হ্যাট্রিক করে ফেললো।
খেলা শেষ। রেল কলোনি জেতার হ্যাট্রিক করলো। কানে এলো কে যেন বলছে ,”আরও আনো বাইরে থেকে প্লেয়ার ”
মন বেজায় খারাপ হয়ে গেলো। কোনো কথা না বলে পা চালালাম। লোকজন এড়িয়ে যাবো বলে বাঁশ বাগানের রাস্তাটা ধরলাম। আর সেখানেই হঠাৎ চোখে পড়লো আজকের হিরো সেই গোঁফওয়ালা ছেলেটা।
আমায় দেখে পালতে গিয়েও ধরা পড়ে গেলো। আমি অভিনন্দন জানাতে হাত বাড়িয়েও গুটিয়ের নিলাম।একে চেনা চেনা লাগছে। ততক্ষনে স্পিরিট গামের আয়ুও ফুরিয়েছে। গোঁফটা একদিকে আলগা হয়েছে। আমি কাল বিলম্ব না করে এক টানে গোঁফটা খুলে দিলাম। অপার বিস্ময়ে ,হতবম্ভের মত দেখলাম আমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সেই আজকের হ্যাট্রিক করা নায়ক আর কেউ নয় ; স্বয়ং কুসুম। সেই বাচ্চা মেয়ে যে লুকিয়ে এসেছিলো কোলকাতা ক্লাবে খেলা আমায় দেখতে।
আমায় দেখে আমার দু পা জড়িয়ে ধরে বললো, ”কাউক্কে বলুনি বাবু। শিবনাথ বাবু ছাড়া কেউ জানেননা ”
-“কে শিবনাথ বাবু ?”
-“ ইস্টিশন মাস্টার। ওই তো খেলা শেখায়। আমি ওর থেকেই শিখেছি ”
আমি চাইলে একটা কমপ্লেন ঠুকতে পারতাম যে ছেলেদের টুর্নামেন্টে একজন মেয়েকে ছেলে সাজিয়ে খেলানো বের করে দিতাম। সেটা না করে ওকে বললাম, ”কলকাতা যাবি ?
কুসুম এক কথায় রাজি।
জিগেস করলাম,” স্কুলে পরিসনা ?”
কুসুম বললো “নাঃ ”
আমি বললাম,” আমি নিয়ে গেলে কিন্তু স্কুলে ভর্তি করে দেব। আর তার সাথে ফুটবল শেখাবো। রাজি ?”
কুসুম বললো ,”হ্যাঁ রাজি ”
বাপ্ মা মরা কুসুমকে নিয়ে কোলকাতা চলে এলাম স্টেশন মাস্টার শিবনাথ বাবুর অনুমতি নিয়ে।
ট্রেনে শুনলাম আজ ১৪ই নভেম্বর। শিশু দিবস । আমি জানি আজ একটি শিশুর মধ্যে এক প্রতিভা জন্ম নিলো। তার জন্য কোনো পড়াশুনোর দরকার হয়না। এ প্রতিভা ভগবান প্রদত্ত। আর আমি জানি এই কুসুম একদিন পূর্ন পুষ্প রূপে বিকিশিত হবেই। আর আমি হব তার মালি।
——————-
আজ আবার শিশু দিবস। পাড়ায় অনুষ্ঠান প্রাক্তন ফুটবলার হিসেবে আমি অতিথির আসনে জায়গা পেয়েছি। আমায় বক্তব্য রাখতে বলা হলো। সবে শুরু করেছি এমন সময় হৈ হৈ আওয়াজে বক্তব্য বন্ধ রাখতে বাধ্য হলাম। সবার দৃষ্টি ঘুরে গেছে কালো গাড়িটার দিকে। আমি জিগেস করলাম এক উদ্যোক্তাকে ,”কে এসেছে ?”
উদ্যোক্তা বললো ,”আন্ডার ১৭ মেয়েদের বিশ্বকাপে জার্মানিকে হারানো ভারতীয় দলের ক্যাপ্টেন কুসুম শিকদার “
চকিতে তাকিয়ে দেখলাম কুসুমই বটে। হেঁটে আসছে মঞ্চের দিকে। উৎসাহে ,আবেগে সবাই ফেটে পড়ছে। এর মধ্যে আমার বক্তৃতা অবান্তর বুঝে আমি স্টেজ থেকে নেমে মিশে গেলাম দর্শকদেড় মধ্যে।
এখন মঞ্চে কুসুম। হাতে মাইক। আমি ভিড় ঠেলে উঁকি দেবার চেষ্টা করলাম। কানে এলো কুসুমের গলা ”আজ শিশু দিবস। ৬ বছর আগে এক শিশু একজনের হাত ধরে গ্রাম থেকে কলকাতায় এসেছিলো। আর তারপর সেই মানুষটা নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে শিশুটিকে ফুটবলার করে তুলেছিল। আমি জানি উনি এখানেই আছেন। তাকে আমি আজো বাবু বলেই ডাকি।তিনি আপনাদের পাড়ারই বাসিন্দা প্রাক্তন ফুটবলার শ্রী অসিত বিশ্বাস। বাবু একবার আসবে স্টেজে ?”
আর আমার কিছু করার ছিলোনা। দর্শকরাই আমায় স্টেজে তুলে দিলো। পায় হাত দিয়ে কুসুম প্রণাম করে বললো ,”আশীর্বাদ করো আমিও যেন প্রত্যেক শিশু দিবসে একটা করে কুসুম ফোটাতে পারি ”
আমার সব আশীর্বাদ তখন আমার চোখের জল হয়ে ঝরছে !
******************************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *