ছিনতাইবাজ – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

********************************************

IMG_1213সেন জুয়েলারি হাউস থেকে বেরিয়ে বিপ্রদাস বাবু এদিক ওদিক দেখে নিলেন। নাঃ কেউ তেমন সন্দেহজনক নেই। কাঁধের বাগে আরেকবার হাত ঠেকিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলেন বাক্সটাকে। বাক্সে একটা সদ্য কেনা নেকলেস আছে। মেয়ে বিদীপ্তার জন্য। পরের মাসে বিদীপ্তার বিয়ে। সারা জীবনের একটু একটু করে করা সঞ্চয়ের অনেকটাই ব্যায় হবে তাঁর। তা হোক। এই জন্যই তো রোজগার করা। স্ত্রী মারা গেছেন বছর পাঁচেক আগে। স্ত্রীর অসুখেও অনেক টাকা খরচা হয়ে গেছিলো আর তাই তাঁকে হিসেবে করে পা ফেলতে হচ্ছে।
গলির মোড় ঘুরেই একটা পানের দোকান। তার সামনেই ছেলেটাকে চোখে পড়লো। এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে বিপ্রদাস বাবুর দিকে। বিপ্রদাস বাবুর একটু ভয় করলো। যা ছিনতাইবাজের উপদ্রব হয়েছে আজকাল তাতে চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিপ্রদাস বাবুর ওই পথটাই ধরতে হবে। অর্থাৎ ওই ছেলেটির পাশ দিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। ব্যাগটা ভালো করে বগলদাবা করে বিপ্রদাস দ্রুত বেগে হাঁটতে শুরু করলেন। ছেলেটিকে পাশ কাটিয়ে ডানদিকের রাস্তায় এসে একটা হাঁফ ছাড়লেন। যত তাড়াতাড়ি হয় তাঁকে বাড়ি পৌঁছতে হবে।
কিছুদূর গিয়ে একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ডাকে পেছনে তাকালেন তিনি। যা দেখলেন তাতে বুকের রক্ত জল হয়ে গেলো। সেই ছেলেটা। তাঁর পিছু নিয়েছে।
এতক্ষন যেটা তাঁর সন্দেহ ছিল সেটা এখন বিশ্বাসে পরিণত হলো। এ ছিনতাইবাজ না হয়ে যায়না। গ্রীষ্মের দুপুরের শুনশান গলি। যদি মেরে পুঁতে ব্যাগ নিয়ে পালায় তাহলেও কেউ জানতে পারবেনা। বিপ্রদাস বাবু হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন।
বিপ্রদাসবাবুর জোরে জোরে নিশ্বাস পড়ছে। এই বয়েসে এতো জোরে হাঁটা যায়? একবার পেছনে তাকালেন বিপ্রদাস বাবু। তাঁর সাথে সাথে আরেকজনের হাঁটার গতি বেড়েছে। সেই ছেলেটা। এখনো তাঁর পিছু নিয়েছে।
গলির এই জায়গাটা বেশ সুনসান। বিপ্রদাস বাবুর পেছনে ছেলেটা আর একটা কালো গাড়ি। বিপ্রদাসবাবুর আর কোনো সন্দেহই রইলোনা। ছেলেটা একবার ব্যাগটা হাতাতে পারলে ওই গাড়িতেই লাফিয়ে উঠে পড়বে আর ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে।
ঘামে পাঞ্জাবি ভিজে গেছে। কি হবে এবার ? হারটা যে বাঁচাতে পারবেননা সেটা তিনি এতক্ষনে বুঝে গেছেন। প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবেন তো ? পকেটমারদের মায়া দয়া খুবই কম।
এসব ভাবতে ভাবতেই তিনি আবার পেছনে তাকালেন আর যা দেখলেন তাতে তাঁর হৃদস্পন্দন দ্বিগুন হয়ে গেলো।
আপাত নিরস্ত্র ছেলেটির হাতে অকস্মাৎ একটা জিনিস চলে এসেছে। একটা ছুরি। তার লকলকে ফলাটা সোজা তাঁর দিকেই উঁচিয়ে আছে।
বৃদ্ধ এবার দৌড় শুরু করলেন।
পেছনে খচমচ আওয়াজ কানে এলো। বিপ্রদাস বাবু বুঝলেন পেছনের ছেলেটিও দৌড়োচ্ছে আর তার সাথে দৌড়োচ্ছে তীক্ষ্ণ ফলাওয়ালা ছুরিটা।
পায়ের শব্দ এবার এক্কেবারে কাছে। প্রায় ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। এবার কি হবে? ব্যাগে টান পড়বে না ছুরির আঘাতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়বেন ? চোখে অন্ধকার দেখলেন বিপ্রদাস বাবু।
যখন সব শেষ হয়ে যায় তখন মানুষ এক অজানা বল পায় আর সেই বলেই বিপ্রদাস বাবু ঘুরে তাকালেন !
তাঁর দুহাতের মধ্যে ছেলেটি দাঁড়িয়ে। হাতে ছুরিটা ফণা তুলে আছে শিকারের অপেক্ষায়। আর কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা। বিপ্রদাস বাবু আত্মরক্ষার জন্য শেষ অস্ত্রটি প্রয়োগ করলেন। একটা সজোরে ঘুঁসি।
ছেলেটি ছিটকে পড়লো আর ছুরিটাও পড়লো তার পাশে। বিপ্রদাস বাবু হটাৎ যেন বিদুৎপৃষ্টের মতো থমকে গেলেন। কিছু একটা দেখে তিনি চিনতে পেরেছেন। একটু ঝুঁকে তুলে নিলেন ছুরিটা। এটা মানুষ মারার ছুরি নয়। ফল কাটার নিরীহ ছুরি। ছুরির বাঁটে নকশা করা।
সেন জুয়েলারীতে ঢোকার আগে বিপ্রদাস বাবু একটা কাঁটা চামচ আর ছুরির সেট কিনেছিলেন। মেয়ের বিয়েতে তত্ত্বে দেবার জন্য। আগে প্ল্যান ছিলোনা কিন্তু বিশ্বনাথ ভাণ্ডারে শোকেসে সাজানো কার্টলারি সেট দেখে আর সেটা বাজেটের মধ্যে হয়ে যাবার ফলে নিয়ে নিয়েছিলেন। অসাবধানতাবসতো একটা ছুরি কোনো ভাবে ব্যাগ গলে রাস্তায় পরে যায়। ছেলেটি সেটাই তাঁকে দিতে এসেছিলো।
বিপ্রদাসবাবু ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন ,” আমায় একবার ডেকে বলতে পারতে তো !তাহলেই এই অন্যায়টা হতোনা !”
-“কি করে বলবে বাবু। ও যে বোবা কালা।” কথাটা এলো বিপ্রদাসবাবুর পাশের খবরের কাগজের দোকান থেকে।
কাগজওয়ালা বলে চললো ,” কথা বলতে পারেনা। কানেও শোনেনা। কিন্তু খুব পরোপকারী। সবাই বোঝেনা তাই নানা বিপদে পড়ে । বারণ করলেও শোনেনা।তিন কূলে কেউ নেই। আমাদেরই কারও দোকানে রাতে শুয়ে থাকে ।”
ছেলেটা দুটো দুটো বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে বিপ্রদাসবাবুর দিকে। ঘুসিতে নাকে রক্ত জমে গেছে। কিন্তু মুখে একটা সারল্যের হাসি। ওদিকে বিপ্রদাস বাবুর চোখ তখন জলে ঝাপসা। ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বললেন ,” আমায় বাড়ি পৌঁছে দিবি তুই ? মেয়েটার বিয়ের পর আমি এক্কেবারে একা হয়ে যাবো। থাকবি আমার কাছে ?”
সে বোবা কালা কি বুঝলো কে জানে ? বিপ্রদাস বাবুর হাত ধরে সে করমর্দনের মতো দুবার ঝাঁকিয়ে দিলো !
********************************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )
#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *