গুন্ডা – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

************************************

My Profile Pic

গোবেচারা , ভীতু , খানিকটা পাগলাটে বুড়োটাকে পাড়ার সবাই খ্যাপা দাদু বলে ডাকে। আসল নাম কি তা কেউ জানেনা। শ্রী কলোনির খেলার মাঠের পাশে পাঁচু মুদির দোকান। তার পাশের ইঁট পাতা রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলে খ্যাপা দাদুর বাড়ি। বাড়ি না বলে ভগ্ন স্তুপ বললে বাংলা ভাষার প্রতি সুবিচার করা হবে। বাড়ির গায়ে কর্পোরেশনের লাগানো ‘বিপজ্জনক বাড়ি’ সাইন বোর্ডটাও ভেঙে পড়েছে। সেই একতলা প্রাগৈতিহাসিক বাসস্থানে দুটো হুলো বেড়াল আর একটা নেড়ি কুকুরের সাথে দাদুর বাস।
দাদুর বয়েস প্রায় পঁচাশি। সকালে একটা নীল রঙের থলে নিয়ে বাজারে যান। পাড়ার কারো সাথে মেশেন না আর পাড়ার কোনো লোকের ব্যাপারে ওনার এক বিন্দুও উৎসাহ নেই। শুধু ঝামেলা ঘটায় “উজ্জয়নী” ক্লাবের কিছু উঠতি সদস্য, যারা সবে নিজেদের মাতব্বর ভাবতে শুরু করেছে। এরা একটু বেপরোয়া , ডাকাবুকো গোছের। আগে যেমন পাড়ায় একটা সুস্থ পরিবেশ ছিল সেটা অনেকটাই বিঘ্নিত হয়েছে এই উঠতি মাস্তানদের দৌরাত্বে।
এদের মুখে সিগারেট ছাড়াও হাতে থাকে সাইকেলের চেন আর হকি স্টিক। কি কখন কাজে লেগে যায় কে জানে। বিশেষতঃ পাশের পাড়ার ক্লাবের সেক্রেটারি নিতু এখন গুন্ডা হিসেবে বেশ নামডাক করেছে। তার দাপটও মারাত্মক। মাঝে মাঝে শ্রী কলোনির মাঠে টিম নিয়ে খেলতে আসে। তারপর হার জিৎ নিয়ে ঝামেলা ,গন্ডগোল আর সবশেষে মারপিট।
দাদুকে খ্যাপা দাদু নামটা দিয়েছে বিলু। সে শ্রী কলোনির ক্লাব প্রেসিডেন্ট।
প্রথম প্রথম অতটা বোঝা যায়নি। কিন্তু পরবর্তী কালে দাদুর ইতিউতি ইতঃস্তত চাহুনি, মুখে একটা ভয়ের আস্তরন আর সমাজ বিমুখতা, তাঁকে নিয়ে এক কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে । যদিও তাঁর সম্বন্ধে কিছুই তেমন জানা যায়নি কিন্তু খ্যাপা তকমাটা পেতে সাহায্য করেছে।
এই সেদিনের ঘটনা। দাদু বাজার থেকে ফিরছেন থলিতে ২ টো মাগুর মাছ নিয়ে। বিলু আর তার দলবল পাঁচিলে বসেছিল। হঠাৎ বিলু দাদুকে দেখে বলে উঠলো,
“ও দাদু , মাছ দুটো পুষবে নাকি ? হুলো আছে , কুত্তা আছে এবার কি মাছ ? “
বিলুর পাশ থেকে নেত্য বলে উঠলো ,”তা রাঁধবে কে দাদু। একটা বিয়ে করে নিয়ে যাও রাস্তা থেকে !”
শেষের রসিকতায় দলের বাকি সবাই সশব্দে হেসে উঠলো আর দাদু ওই জায়গাটুকু পেরোবার জন্য যত দ্রুত সম্ভব পা চালালেন আর তখনি বিপদটা ঘটলো।
তাড়াতাড়ি হাঁটতে গিয়ে ধুতির কোঁচায় পা বেধে ধমাস করে পড়ে গেলেন দাদু আর থলে থেকে মাগুর মাছ ছিটকে নর্দমায় পড়ে পুনর্জীবন লাভ করলো। দাদুর ধরাশায়ী অবস্থা দেখে কেউ এগিয়ে তো এলোই না বরং বিলু আর তার দলবল ব্যঙ্গ বিদ্রুপের নতুন খোরাক পেয়ে গেলো।
লাড্ডু বিলুর চ্যালা। সে দাদুর পা দুটো ধরে ওপরে তুলে ,”দাদু ওঠো। . খ্যাপা উঠে পড় ” বলে এদিক ওদিক ঘোরাতে লাগলো এমন ভাবে যে দাদু যাতে উঠে বসতেও না পারে। রাস্তায় লোকেরা নির্বাক দর্শক। কারো কারো খারাপ লাগলেও গুন্ডা বাহিনীর ওপর কথা বলবে এমন বুকের পাটা তাদের নেই।
বিদ্রুপ যখন চরমে তখন বিলুদের একটু থমকাতে হলো। কারণটা আর কিছুই না। একজন এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করেছে। একটি যুবতী মেয়ে। বয়স খুব বেশি হলে পঁচিশ। নীল সালোয়ার। কাঁধে ব্যাগ। সম্ভবতঃ অফিসে যাচ্ছে। এ পাড়ার কেউ নয়।
বিলু এগিয়ে এসে মেয়েটিকে ভালো করে একবার ওপর থেকে নীচ অবধি দেখে নিলো। ততক্ষনে দাদুকে ছেড়ে বাকিরা এসে দাঁড়িয়েছে বিলুর পাশে।
মেয়েটাকে ওপর থেকে নীচ অবধি জরিপ করে নিয়ে বিলু বললো ,” তুমি কে মামনি ?”
নেত্য স্বগতোক্তি করলো , “একদম টাটকা ! সবে কলি ফুটেছে “
দেবু ফুট কাটলো ,” ও দাদু তোমার বৌ পাওয়া গেছে। একেই বিয়ে করে নিয়ে যাও। তোমায় মাগুর মাছ কেটে দেবে। “
বিলু এর মধ্যে মেয়েটার সামনে এগিয়ে দাঁড়িয়েছে। এক পা এক পা করে বিলু এগোচ্ছে মেয়েটার দিকে। মেয়েটাও ভয়ে পেছোচ্ছে এক পা এক পা করে। রাস্তার লোকেরা নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে। বিলুদের মুখের ওপর কথা বলার স্পর্ধা তাদের নেই।
বিলু বললো , “ এমনি কি করে দাদুর হাতে তুলে দি? আগে আমরা একবার চেখে নি ! কি বলো দাদু ? রাজি তো ?” এই বলে মেয়েটার হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান মারার সাথেই ঘটে গেলো ঘটনাটা। ছিটকে পড়লো বিলু। কে যেন ওর গালে একটা কষে চড় হাঁকিয়েছে। বিলু কিছুক্ষনের জন্য চোখে অন্ধকার দেখলো।
একটু সম্বিৎ ফিরতে বিলু দেখলো তার বুকের ওপর পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে তাদের বিদ্রুপের পাত্র খ্যাপা দাদু। কি অমানুষিক গায়ের জোর। নেত্য হকি স্টিক তুলে ছুটে এলো দাদুর দিকে। ফল হলো এক। একটা সজোরে কুনুইয়ের আঘাতে স্টিক হাতে ছিটকে পড়লো নেত্য। দেবু আর এগোবার সাহস জুটিয়ে উঠতে পারলোনা।
ততক্ষনে বৃদ্ধ এক হাতে হেঁচড়ে তুলে বিলুকে ঠেসে ধরেছে একটা গাছের সাথে। বিলু ছটফট করছে। দাদুর যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সম্মোহিত যন্ত্রের মত দাদু আচরণ করছেন। শেষে পুলিশের পেট্রল ভ্যান এসে বিলুকে উদ্ধার করলো। আরেকটু দেরি করলে বিলুকে শ্বাস রোধ করে মেরে ফেলতেন দাদু।
পুলিশ সব শুনলেও দাদুকেও থানায় নিয়ে গেলো। মেয়েটিও সাথে গেলো। দাদুর বাড়ি খানা তল্লাশি হলো তার পরিচয় জানতে। কারণ তিনি মুখে একটা কথাও বলেন নি। কিছু নথি পত্র উদ্ধার হলো আর তার থেকে যা জানা গেলো তাতে সবার মাথা ঘুরে যাবার জোগাড়।
দাদুর আসল নাম গোপেশ্বর হালদার। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক আলোচিত নাম। অসম্ভব গায়ের জোরের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। অত্যাচারী পুলিশ ইন্সপেক্টর J Aletnol কে শ্বাস রোধ করে হত্যা করেন। হাতে অস্ত্র থাকা স্বত্তেও Aletnol কিস্যু করতে পারেনি। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গোপেশ্বর। চলে নির্মম অত্যাচার আর তাতেই মানসিক ভারসাম্য হারায় সে। একদিন জেল থেকে পালায়। তারপর তার খবর আর কেউ পায়নি।
মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়লো আর রাজনৈতিক দল গুলোর মধ্যে টানাটানি পড়ে গেলো গোপেশ্বরকে নিয়ে।
আজ পাড়ায় তার সম্বর্ধনা। বিলু সব ব্যবস্থা নিজে করেছে। মাইক টেস্ট করা শেষ। এবার সে চললো গোপেশ্বরকে আনতে তার বাড়ি থেকে।
বিলু ঘরে ঢুকে দেখলো কেউ নেই। বাড়ি ফাঁকা। কুকুর আর বিড়াল গুলো একটা অদ্ভুত সুরে ডেকে চলেছে। অনেকটা কান্নার মতো।
রাইটিং ডেস্কে একটা চিঠি রাখা। সেটা তুলে নিলো বিলু। সেখানে লেখা আছে , “ এই স্বাধীন দেশ তো আমরা চাইনি। যেখানে মা বোনের ইজ্জত নেই। যেখানে প্রৌঢ়দের নিয়ে তামাশা করা হয় সেখানে আমার কোনো জায়গা নেই। তাই আমি চললাম। যেদিন এমন দেশ গড়ে উঠবে যেখানে মানুষ একে অপরকে শ্রদ্ধা করবে সেদিন জানবো আমি আমার সম্বর্ধনা পেয়েছি !”
হতবম্ভের মতো দাঁড়িয়ে রইলো বিলু। পাড়ার সবচেয়ে ডাকসাইটে গুন্ডার চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে !
**************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )
#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *