রাখি পূর্ণিমা – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

************************************************

Myself1

উত্তর প্রদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই গ্রামটা। নাম বালদেওপুর। সেখানেই ছেলেটার বাড়ি।
ছেলেটাকে সবাই আদর করে মুন্না বলে ডাকে । বাপ্ মায়ের বড় আদরের একমাত্র সন্তান। পরিবারের চোখের মনি। বয়স হবে সাত কি আট । কিন্তু এর মধ্যেই দারুন চৌখস। স্কুলে ফার্স্ট হয়। সবাই বলে বড় হয়ে মস্ত ডাক্তার হবে আর বাবা মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে।

সেই মুন্না কদিন ধরে গুম মেরে আছে। মুখে খুব সামান্য কথা। খাওয়া দাওয়া মোটামুটি ছেড়ে দিয়েছে। বাড়ির সবাই খুব চিন্তায়। অনেক বার কারণ জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও সে বলেনি। ছেলের যে কি হলো ভেবে ভেবে তার মা চোখের নিচে কালি ফেলে দিয়েছেন।

রাকেশ মুন্নার প্রাণের বন্ধু। একদিন রাকেশকে মুন্না বললো , “তোকে একটা কথা বলবো। কাউকে বলবিনা তো ?”
রাকেশ গলায় একটা চিমটি কেটে বললো ,” তিন সত্যি করলাম। কাউকে বলবোনা ”
মুন্না এদিক ওদিক তাকিয়ে রাকেশের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললো ,” আমি ভূত দেখেছি ”
রাকেশ চমকে ওঠে ,” সেকি ? কবে কোথায় ?”
মুন্না আবার গলা নিচু করে বললো ,” আমাদের বাড়িতে। বাগানে। রোজ রাতে আসে। আমায় জানলা দিয়ে ডাকে। ”
রাকেশ চোখ গোল গোল জিগেস করলো ,” দেখতে কেমন?”
ফিসফিস করে উত্তর এলো ,” একটা মেয়ে। ফ্রক পরা।”
রাকেশ পাক্কা যুক্তিবাদী সমিতির লোকেদের মতো ভ্রু কুঁচকে বললো , “ভূত কি করে বুঝলি ?”
মুন্না ধরা গলায় উত্তর দিলো , “চোখের সামনে হাওয়ায় মিলিয়ে যায় যে ”
রাকেশ আবার জিগেস করে ,” তুই নিজে দেখেছিস?”
মুন্না উত্তরে যা বললো তাতে রাকেশের রক্ত জল হয়ে গেলো। বাগানের শিউলি গাছের দিকে তাকিয়ে মুন্না কাঁপা গলায় বললো , ” কথাও বলেছি ”
-“কি বলে তোকে ”
একটা ঢোক গিলে মুন্না বললো ,” আমায় ভাই বলে ডাকে। ”
রাকেশ জিগেস করলো আর তুই কি বলিস ,
– ” আমি দিদি বলি ”
মুন্না আরও বললো ,” রাতে যখন সব্বাই ঘুমিয়ে পড়ে তখন আমি চুপি চুপি বাগানে গিয়ে দাঁড়াই। তারপর দিদি আসে। আমায় খুব ভালোবাসে ”
রাকেশ একটু চ্যালেঞ্জের সুরে বললো , “আমায় দেখাতে পারবি? ”
-“পারবো। কাল আসিস ”
-” কাল যদি তোর ভুতুড়ে দিদি না আসে ?”
মুন্না চাপা গলায় বললো ,” কাল দিদি আসবেই ”
রাকেশ একটা হাসি দিয়ে বললো ,”কি করে জানলি ?”
মুন্না ফিসফিস করে বললো ,” কাল যে রাখি ”

পরের দিন আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। জোছনায় ভেসে যাচ্ছে মুন্নাদের বাগান। রাকেশ লুকিয়ে রইলো একটা গাছের আড়ালে ঠিক রাত বারোটায় মুন্না বাইরে এসে চাপা গলায় ডাকলো “দিদি .. আমি এসেছি ”
কিছুক্ষন পর যেন চাঁদের আলোর রুপালি সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো এক বছর দশেকের মেয়ে। পরনে একটা ফুল কাটা ফ্রক। সে এসেই মুন্নাকে জড়িয়ে ধরে আদর করলো। তারপর বললো।, ” তোর হাত দে ”
মুন্না হাত এগিয়ে দিতে ওর হাতে একটা ফুলের রাখি বেঁধে দিলো মেয়েটা।
মুন্না এবার একটা প্রশ্ন করলো। এই প্রশ্নটা অবশ্য রাকেশর শিখিয়ে দেয়া।
-” তুমি কি সত্যি আমার দিদি ?”
মেয়েটি মুচকি হেসে বললো ,” হ্যাঁ রে। আমি তোর দিদি আর তুই আমার এক মাত্র ভাই ”
মুন্না বলল ,” তাহলে তোমার কথা বাবা মা কখনো বলেনি কেন ? আমাদের বাড়িতে তোমার ছবি নেই কেন ?
মেয়েটি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। মুন্না লক্ষ্য করলো মেয়েটির চোখে জল|
নীরবতা ভেঙে মেয়েটাই উত্তর দিলো ,” ওঁরা আমায় কক্ষনো দেখেন নি ”
“কেন ?” প্রশ্ন করলো মুন্না
মেয়েটি , “জানিনা রে ” বলে মিলিয়ে গেলো।

রাকেশের চোখ ছানা বড়া। মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে গেলে রাকেশ বেরিয়ে এলো গাছের আড়াল থেকে আর তারপর গোঁ গোঁ শব্দে অজ্ঞান হয়ে গেলো। মুন্নার চেঁচামেচিতে বাড়ির লোকেরা বেরিয়ে এলো বাইরে আর স্বভাবতই প্রশ্ন এলো মাঝ রাতে তারা বাগানে কি করছিলো।

রাকেশের জ্ঞান ফিরতে সে নিজের মুখেই সব বললো। মুন্না ওর বাবাকে জিগেস করলো ,” আমার দিদির কথা আমায় বলোনি কেন বাবা ?” মুন্নার বাবা অবাক ও বিরক্তি মিশিয়ে বললো ,”কি বাজে বকছিস। তোর দিদি কথা থেকে আসবে ? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? ”
মুন্না হাতের রাখিটা দেখিয়ে বললো ,”তাহলে এটা আমায় পরালো কে ?”
এবারে মুন্নার বাবা দীননাথ বেশ ঝাঁঝিয়ে উঠলো ,”ওসব পরে দেখা যাবে। এখন যাও শুয়ে পড়ো। ”
সবাই একে একে ঘরে গেলো। শুধু গাছের নিচে বসে রইলো মুন্নার মা লছমী। দীননাথ এসে তাকেও বললো ঘরে যেতে।

লছমী যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালো আর তারপর বজ্র কঠিন গলায় তার স্বামীকে বললো ,” তুমি বুঝতে পারছোনা কে আসে ?”
দীননাথ বললো ,” আমি জানিনা ”
লছমী দাঁতে দাঁত চেপে বললো ,” আমি জানি। মুন্নার আগে আমার পেটে মেয়ে এসেছিলো। তুমি মেয়ে চাওনি। তোমার বন্ধু ডঃ মিশ্রর হাসপাতালে সেদিন তুমি আইনের চোখে ধুলো দিয়ে আমায় না বলে ভ্রুন পরীক্ষা করালে। মেয়ে শুনে ওখানেই শেষ করে দিলে ওকে। আমার. মেয়ে পৃথিবীর আলোই দেখলোনা। কিন্তু ওপরে ভগবান আছেন। তোমার পাপ চাপা থাকবেনা। সেই মেয়েই প্রতিদিন আসে ওর ভাইয়ের সাথে দেখা করতে ”
এই অবধি বলে চুপ করলো লছমি। কারণ দুজনেরই দৃষ্টি পড়েছে শিউলি গাছের নিচে। সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে ফুটফুটে একটা মেয়ে। হাতের তর্জনী তুলে সে যেন জানতে চাইছে “কেন এমন করলে বাবা ? ”
তারপর নিজে থেকেই একটা দমকা হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো |
লছমী “বেটি ” বলে চিৎকার করে উঠলো।
দীননাথ অস্ফুট স্বরে বললো ,” চুপ কর লছমি। চুপ কর। আমি পাপ করেছি। শাস্তি আমি নিজেই নেবো ”

পর দিন থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করলো দীননাথ। ডঃ মিশ্র -ও ধরা পড়লো।

*************************************************
কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে !
মুন্না এখন বড় হয়ে গেছে। বিয়ে হয়েছে দু বছর আগে। সেদিন রাতে ওর স্ত্রী যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, মুন্না এসে দাঁড়ালো বাগানে। দিদি এসেছে। এখন সে শাড়ি পড়ে। সেদিন আবার রাখি পূর্ণিমা। মুন্নার হাতে রাখি পরিয়ে দিদি বললো, “আমি আসছি খুব শিগগিরি। এবার তোর কাছেই থাকবো |”

কিছু মাস পরের কথা।
অনেক রাত এখন। মুন্না জানলার দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। সে জানে তার দিদি আর কখনো আসবেনা। কারণ সেই দিদি এখন তার পাশেই শুয়ে আছ| তার একটি ফুটফুটে সদ্যজাত মেয়ের রূপ ধরে।

**************************************
– শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়) – 6/8/17
#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *