দিলদার আলী – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

**********************************

Joy Mukherjee, Santanu Mukherjee, joynama

(Lucknow- 4.8.2017)
**********************************
অফিসের কাজে প্রায়ই আমার বাইরে যেতে হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত এ ভাবেই ঘোরা হয়ে যায়। তো এবার কাজে এসেছি লক্ষ্নৌতে। উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষ্নৌ। লক্ষণের দেশ লক্ষ্নৌ। আগে এসেছিলাম একবার। সেটা বছর দশেক আগে। তার থেকে অনেকটাই বদলে গেছে শহরটা। বেশ একটা নিউ এজ টাইপের হ্যাপেনিং ব্যাপার এসেছে “জনাব ” আর “তাশরীফ রাখিয়ে” বলা এই শহরে।
এটা শহরের নতুন অংশ। যাকে নিউ লক্ষ্নৌ বলে। এখানে নবাবী স্থাপত্য কিছুই নেই। হজরতগঞ্জ বা আমিনাবাদের ঘিঞ্জি ব্যাপারটা নেই। একটু বরং কর্পোরেটীয় ছোঁয়া আছে। ক্লায়েন্ট অফিসে মিটিং শেষ করে যখন বেরোলাম তখন ঘড়িতে আটটা সতেরো। ইচ্ছে ছিল একটু মার্কেট গিয়ে চিকনের কাপড় কেনার কিন্তু ঘড়ি দেখে হোটেলে ফিরে যাওয়াই উচিত বলে মনে করলাম।
এখন যাতায়াতের সুবিধা অনেক। স্মার্ট ফোনের App -এ মৃদু চাপ দিতেই ট্যাক্সি পাওয়া গেলো। ৫ মিনিট দূরত্বে আছে। ড্রাইভারের নাম করিম খাঁ। একটু পরে এসে দাঁড়ালো সাদা রঙের একটা গাড়ি। নম্বর মিলিয়ে উঠে বসলাম। ট্যাক্সীটা একটু এগিয়ে বাঁ দিকে একটা রাস্তা ধরলো। আমি লক্ষ্নৌ না চিনলেও সকালের আসার রাস্তাটা খেয়াল আছে। তাই বাঁ দিকে বেঁকতে আমি হিন্দিতে জিগেস করলাম , ” কোনদিকে যাচ্ছেন ? আমার হোটেল সোজা ”
লোকটা চোস্ত উর্দুতে জবাব দিলো ,” ধৈর্য রাখুন। আমি ঠিক পৌঁছে দেব ”
এবার যেটা ঘটলো তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। গাড়িটা অন্ধকার গলি ছেড়ে একটা আলো ঝলমল এলাকায় ঢুকলো। এখানে লোকেদের সাজ পোশাক ভিন্ন। অনেকটা নবাবী কায়দায় ভরপুর। পানের দোকানে জটলা। সারেঙ্গীর সুর ভেসে আসছে। আর কিছু লাস্যময়ীর কলকাকলির সাথে সেই সুর মূর্ছনার মতো আছড়ে পড়ছে রাতের শহরে। ঘড়ি দেখলাম সাড়ে নটা। লোকটা আমায় দেড় ঘন্টা ঘুরিয়ে এ কোথায় নিয়ে এলো? মাঝে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তার মধ্যে এটা কি ঘটে গেলো।
আমি এবার বেশ বিরক্ত হয়ে বললাম ,” কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমায় ?”
লোকটা অবাক হয়ে বললো এই সময় নাকি আমার এখানেই আসার কথা। আমার আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা। আমি এই নিয়ে লক্ষ্নৌ দ্বিতীয়বার এলাম। আর এ জায়গায় আমি জন্মে আসিনি। এর মধ্যে গাড়ি দাঁড়িয়েছে। করিম খাঁ নেমে এসে দরজা খুলে বললো ,” আইয়ে জনাব। ফুলেরি বাই কা কোঠি আ গায়া !”
– কে ফুলারি বাই ?
আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। এর মধ্যে একজন মধ্যে বয়স্কা মহিলা এসে হাজির। তিনি একটা আদাব ঠুকে বললেন , “নবাব দিলদার আলী ? মেরে কোঠে মে ? ”
আমি সমীহের সাথে বললাম আমি দিলদার আলী নই আর ওই নামে কাউকে চিনি না।
ততক্ষনে আরও কিছু লোক জড়ো হয়ে গেছে। তাদের হাবভাব দেখে বুঝলাম তারা ভাবছে আমি মস্করা করছি। আমায় ওপরে নিয়ে যাবার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। কি করবো বুঝতে না পেরে ওদের কথা মতো সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করলাম। ওপরে মজলিস বসেছে। চড়া সুরে কেউ একজন ইমন রাগে খেয়াল ধরেছে। ঠিক সেই সময় আমি দেখলাম আমার সামনে সুসজ্জিতা এক নারী। অপরূপ তার চাহুনি। গহনায় সে আবৃতা। তাকে একজন বললো ,” ফুলারি হুজুরের যত্ন করবি। নবাব বলে কথা ”
আমি ততক্ষনে বুঝে গেছি আমি কোথায় ফেঁসেছি। আমায় ফুলারি একটা ঘরে নিয়ে গেলো। ঝাড়বাতির আলো আর আতরের গন্ধে ভরা সেই ঘর। বুকে ঢিপ ঢিপ শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এ যেন একশো বছর পিছিয়ে গেছি এক ধাক্কায়। সামনে একটা নিচু বারান্দা। আমি এক ছুটে সেখানে গিয়ে মারলাম একটা লাফ। পাশের একতলা বাড়ির ছাদে গিয়ে পড়লাম। সেখান থেকে আরেক লাফে রাস্তায়। তারপর উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়। অন্ধকারে গলির মধ্যে কোথায় যাচ্ছি জানিনা। কানে এখনো ইমন রাগ ভেসে আসছে। ওই তো একটা বাড়ি। আলো জ্বলছে। দরজায় গিয়ে সজোরে আঘাত করলাম। এতক্ষনে গানের সুর মিলিয়ে গেছে।
দরজা খুললেন এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। আমি শুধু একটা কথা বলতে পারলাম। “জল। …. একটু জল ।” আমার অবস্থা দেখে আমায় ভেতরে নিয়ে গেলেন। দু গ্লাস জল এক নিঃশ্বাসে খেয়ে একটু সুস্থ বোধ করলাম। তারপর ভদ্রলোককে পুরো ঘটনাটা বললাম।
উনি শুনে একটু হাসলেন। আর তারপর ভেতরে গিয়ে একটা পুরোনো বই নিয়ে এসে আমার দিকে খুলে ধরলেন। এক নবাবের ছবি। কিন্তু একি ! এযে হুবহু আমার ছবি। শুধু গোঁফ দাড়িটা অতিরিক্ত। আমার দাড়িগোঁফ নেই কিন্তু লাগালে হুবহু ওই ছবিটার মতো দেখতে লাগবে। ছবির নিচে লেখা আছে নবাব দিলদার আলী । জন্ম ১৮৬৫ মৃত্যু ১৯৩৫
প্রৌঢ় ভদ্রলোক বললেন, “ওদের আর দোষ কি ? আমিই চমকে গেছিলাম। ওখানে কোনো বাঈজী পাড়া নেই। তবে আগে ছিল শুনেছি। ওটা এখন গোরস্থান। আপনাকে দেখে ইতিহাস আবার জেগে উঠেছিল। ওরা মাঝে মাঝেই জাগে। তখন গানের সুর ভেসে আসে। সারেঙ্গীর ছড় শোনা যায়। কেউ বিশ্বাস করে। কেউ করেনা। দিলদার আলী ছিলেন এখানকার নবাব। ঠিক নবাব নয়। তবে নবাবের বংশধর। তখন ইংরেজরা গদির দখল নিয়েছে। তবু দিলদার আলী নিজেকে নবাব বলেই মানতেন আর লোকেরা সেই সন্মান তাঁকে দিতো।

করিম খাঁ ওঁর গাড়োয়ান। প্রতিদিন রাতে ফুলারি বাঈয়ের কোঠায় আসতেন দিলদার আলী। সারা রাত চলত মজলিশ। সেই মজলিস আজ আবার বসেছিল। তাদের দিলদারকে দেখে। যাক আর ভয় নেই। চোখে মুখে জল দিয়ে আসুন। আমি আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দেব। ”
বাথরুমে ঢুকে বেসিনের কলটা খুলে চোখে জলের ঝাপ্টা দিলাম। পাশের দেয়ালে টাঙানো তোয়ালে তে মুখ মুছে পেছনে ঘুরে চমকে উঠলাম। একটা আয়না। তাতে আমার ছায়া পড়েছে। কিন্তু চেহারায় একটা পরিবর্তন এসেছে। যে মুখটা আয়নায় দেখলাম তাতে একটা নিখুঁত ভাবে ছাঁটা গোঁফ আর পরিপাটি করে আঁচড়ানো মুখ ভর্তি দাড়ি।
************************************
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

#SantanuStory

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *