ফেলুদা ফিরে এলো  —— শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)

 

My Profile Pic
******************************************************
–১–
বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ুর কোনো পাত্তা নেই। তাঁর এই prolonged absence -এর কারণ ফেলুদাকে জিগেস করাতে ও বললো যে গত দুদিন ওটা নিয়েই ভেবেছে। ভদ্রলোক মোবাইল ব্যবহার করেননা আর ল্যান্ড ফোনটাও সম্ভবত খারাপ। ফেলুদা বললো, ” আজ একবার ওঁর গড়পাড়ের বাড়িটা ঢুঁ মেরে আসবো। রেডি হয়ে নে তোপসে। “
আমি শ্রীনাথের দিয়ে যাওয়া চা তে সুরুৎ করে চুমুকটা দিয়ে সবে উঠেছি আর তখনি দরজায় বেলটা বেজে উঠলো। দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকলেন লালমোহন বাবু। গম্ভীর মুখ। সে ভাবেই ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন , ” আজও কি একই ভাবে ইগনোর করবেন না কি আড্ডা দেবার মুডে আছেন!” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে একই রকম ভাবে বললেন ,”প্রশ্নটা তোমাকেও করছি তপেশ। “
ফেলুদা ভুরু দুটো যতটা তোলা যায় ততটা তুলে জিগেস করলো , ” ইগনোর মানে ? আপনাকে আজ পর্য্যন্ত কোনোদিন ইগনোর করেছি ?”
লালমোহনবাবু অভিমানী গলায় বললেন , “গত দিন এলাম। দরজা খুলে আপনি আর তপেশ এখানেই বসেছিলেন। একবারের জন্য আমার দিকে তাকালেন না। কথা বলা তো দূরের কথা। আপনারা দুই ভাই অপরাধ জগতে টেকনোলজির ব্যবহার নিয়ে কথা বলতে এতো ব্যস্ত যে আমার উপস্থিতি চোখেই পড়লোনা। আমি আধ ঘন্টা বসে থেকে উঠে দাঁড়ালাম। তাও কোনো ভ্রুক্ষেপ করলেন না। বেরিয়ে চলে এলাম তাও ডাকলেন না পর্য্যন্ত। “
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে চুপ করলেন জটায়ু।
আমি আর ফেলুদা তো দুজনেই হাঁ। কি বলছেন ভদ্রলোক। উনি এলেন অথচ তাঁকে কেউ দেখতে পেলাম না ? এও কি সম্ভব ? কিন্তু উনি যাযা বললেন আমাদের ব্যাপারে সেগুলো সব সত্যি এবং এ ঘরে না থাকলে সেটা কেউ এ ভাবে বলতে পারবেনা।
দেখলাম ফেলুদার মতো ঠান্ডা লোকের মুখ হাঁ হয়ে আছে।
একটা চারমিনার ধরিয়ে ফেলুদা জটায়ুকে জিগেস করলো ,” আপনি আমাদের ডাকলেন না কেন ?”
জটায়ু উত্তেজিত হয়ে বললেন , ” তাও ডেকেছি। তাকালেন না অবধি “
ফেলুদা দুটো পর পর রিং ছেড়ে বললো , ” ব্যাপারটা গোলমেলে লাগছে লালমোহন বাবু। আপনি যা বলছেন সবই মিলে যাচ্ছে কিন্তু আপনার উপস্থিতি টের পাবোনা এটা কি করে সম্ভব। “
এবার দেখলাম জটায়ুর মুখে একটা পরিবর্তন এলো। অনেকটা স্বগতোক্তির মতো করে বললেন , ” তাহলে কি লোকটা যা বললো সব সত্যি ?”
– ” কি সত্যি লালমোহন বাবু? আপনি বলুন। কিছু লুকোবেন না প্লিজ। ” আমি ফেলুদাকে এতো উত্তেজিত আগে কখনো দেখিনি।
লালমোহনবাবু বলে চললেন ,” পার্কে আলাপ। মর্নিং ওয়াক করতে গিয়ে। বললো আমার প্রতিবেশী ফিল্ম ডিরেক্টর পুলক ঘোষালের মামা। ম্যাজিক জানে। একটা লজঞ্চুস দিয়ে বললো খেয়ে নিন। দু ঘন্টা অদৃশ্য থাকবেন। তখন কথাটায় আমল দি’নি।
তবে আপনার বাড়ি ঢোকার আগে একটা লজঞ্চুস খাই। আর তারপরেই আপনাদের ঘরে ঢুকি। “
ফেলুদা হতবাক , বিস্ময় সব এক সঙ্গে মিশিয়ে বলে উঠলো , “তার মানে ? “
উত্তর দিলেন জটায়ু স্বয়ং। “তার মানে আর কিছুই না। আমি দু ঘন্টা অদৃশ্য ছিলাম। তাই আমি আপনাদের দেখলেও আপনারা আমায় দেখেননি “
ফেলুদার কপালে ভাঁজ। বুঝলাম ওর মগজাস্ত্রের কাজ শুরু হয়ে গেছে।

–২–
ঠিক হলো পরদিন আমরাও যাবো লালমোহনবাবুর সাথে মর্নিং ওয়াক করতে। যে ভদ্রলোক জটায়ুকে লজঞ্চুস দিয়েছিলেন তার সাথে আলাপ করা দরকার। অদৃশ্যতার সত্যতা তারপর যাচাই করা যাবে।
কথা মতো পরদিন আমরা ভোর সাড়ে পাঁচটায় হাজির হলাম গড়পাড়ের বাড়িতে। লালমোহনবাবুও মাফলার মাঙ্কি ক্যাপ পরে তৈরী। তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে পার্কে গেলাম। লালমোহন বাবু হাতের তর্জনী দিয়ে একটা বেঞ্চি নির্দেশ করে বললেন, “ওইটায় এসে রোজ বসেন”
ফেলুদা বললো তাহলে এখানেই অপেক্ষা করা যাক | “যখন ৮টা বেজে গেলো আর কেউ এলোনা তখন জটায়ু নিজেই বললেন , “নাঃ ! আসবে বলে মনে হচ্ছেনা। ফেরা যাক ” | তখনো গোটা দুই বয়স্ক মানুষ পায়চারি করছেন। তাঁদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে জিগেস করলেন ,”কাউকে খুঁজছেন কি ?”
ফেলুদাই বললো। “ওই বেঞ্চে যিনি গত কদিন এসে বসছিলেন তাঁকে একটু প্রয়োজন ছিল। “
বৃদ্ধ ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন ,” কে মজুমদার ?
তা ও তো এ পাড়ায় থাকেনা। কদিন সকালে দেখছিলাম আসছিলো।”
ফেলুদা বেশ উত্তেজিত হয়ে বললো , “আপনি চেনেন নাকি ?”
ভদ্রলোক একটা হাঁচি দিয়ে বিলিতি কায়দায় “সরি” বলে বললেন, “আরে না মশাই। এখানেই আলাপ। “
বুঝলাম এখানে থেকে আর লাভ নেই। তাই ঠিক হলো পার্ক স্ট্রিটে ফ্লুরিজে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বাড়ি ফিরবো।

পার্কের বাইরে বেরিয়ে ফেলুদা “এক মিনিট ওয়েট কর ” বলে কোথায় একটা দ্রুত পায়ে গেলো আর কিছুক্ষন পর এসে আমায় বললো , ”একটা জরুরি ফোন করে এলাম”

ফ্লুরিজে ঢুকতেই লালমোহন বাবু ঘোষণা করলেন যে ব্রেকফাস্ট উনি করাবেন। না বুঝে উনি যে ইগনোর করার অপবাদ দিয়েছিলেন সেটার নাকি প্রায়শ্চিত্ত করা প্রয়োজন।
ফেলুদা কিন্তু গম্ভীর। আগেও ওর নানা এরকম অভিব্যক্তি দেখেছি কিন্তু এরকম দিশেহারা অবস্থা এই প্রথম। লালমোহন বাবুও ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন। আর তাই তিনি হঠাৎ টেবিলে একটা চাপড় মেরে বলে উঠলেন , ” আরে দোর মশাই ! কি এতো ভাবছেন। আমার তো কিছু হয়নি। আমি বেঁচে আছি ! অক্ষত। “
আমি বলতে যাবো যে বেনারসের ঘাটেও আপনি একই কথা বলেছিলেন আর ঠিক তখনি ঘটনাটা ঘটে গেলো।
আমাদের ঠিক পেছনে এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়েছেন। লালমোহন বাবুর দিকে ঝুঁকে খুব আস্তে বললেন , “ম্যাজিক কেমন লাগলো ?”
জটায়ু এক ঝটকায় ঘুরে তাকিয়ে বেশ উত্তেজিত ভাবে বলে উঠলো “অবিনাশ তুই ! “
তারপর আমাদের দিকে ঘুরে বললেন “আমার স্কুলের সহপাঠী অবিনাশ। দুজনেই বৈকুণ্ঠ মল্লিকের ন্যাওটা ছিলাম। শেষ দেখা বছর পনেরো আগে। “
অবিনাশ বাবু বললেন ,” কোথায় মনে আছে ?”
জটায়ু হঠাৎ ইংরেজিতে বললেন অফ কোর্স ! ইন দা হোম অফ গ্রেট বিভূতিভূষণ ইন ঘাটশিলা। “
“ম্যাজিকের কথা কি বলছিলেন?” – ফেলুদার প্রশ্নে চমকে তাকালেন অবিনাশবাবু।
তারপর বললেন ,” আমার বন্ধুটিকে নিয়ে মস্করা করার লোভ সামলাতে পারিনি। হয়েছে কি… “
হাত তুলে থামিয়ে দিলো ফেলুদা। তারপর ঠান্ডা গলায় বললো ,” বাকিটা আমি বলি ?”
অবিনাশ বাবু অবিশ্বাসের সুরে বললেন ,”আপনি কি করে বলবেন ?”
ফেলুদা ওর ঠোঁটের পাশে বিখ্যাত হাসিটা দিয়ে বললো,” ম্যাজিক কি আপনি একাই জানেন অবিনাশবাবু। এবার যে একটু ফেলু মিত্তিরের ম্যাজিক দেখতে হয়। “
ভোরের ফ্লুরিজে তখনো লোক হয়নি। আমি , ফেলুদা , জটায়ু আর অবিনাশ বাবু ছাড়া আর একজন মাত্র লোক আছেন আর তিনি একটু তফাতে বসে একটা ইংরেজি কাগজ পড়ছেন। এদিকে কি হচ্ছে তাতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
ফেলুদা বলে চললো ,” মানুষ অদৃশ্য হতে পারে এটা আমি বিশ্বাস করিনি। আমার যুক্তিবাদী মন সেটা মেনে নেয়নি। তাই সেদিন লালমোহন বাবু চলে যাবার পর খুব চিন্তায় পড়েছিলাম। আপনার কাছে কোনোভাবে সাময়িক ভাবে অদৃশ্য হবার একটা ওষুধ ছিল আর সেটা আপনি প্রয়োগ করার লোক খুঁজছিলেন। আপনি জানতেন লালমোহন বাবু সকালে পার্কে বেড়াতে যান আর সেই জন্য ছদ্মবেশ ধরে আপনিও সেখানে হাজির হলেন। পরিচয় দিতে হবে তাই পুলক ঘোষাল এই নামটার আশ্রয় নিলেন কারন ছবির পরিচালক হবার জন্য ওই নামটা আপনি জানতেন। লালমোহন বাবু সরল মানুষ। ওনাকে লজঞ্চুস দেয়া মাত্রই উনি খেলেন। তবে ভাগ্য ভালো যে উনি আমাদের বাড়ির সামনে এসে খেলেন। তারপরের ঘটনা আমরা সবাই জানি। যেটা আপনারা জানেননা সেটা হলো সেদিন লালমোহন বাবু চলে গেলে আমি বাইরে বেরিয়ে একবার চারদিক ভালো করে সার্চ করি আর দরজার পেছন থেকে একটা রাংতার কাগজ পাই। সম্ভবত লজঞ্চুসের খাপ। সেই কাগজ আলোয় মেলতেই আমার কাছে সব পরিষ্কার হয়ে যায়। তাই অবিনাশ বাবু আপনার কীর্তির পেছনে আর একজনের কীর্তি রয়ে গেছে সেটা জানতে বিন্দু মাত্র অসুবিধা হলোনা। যাঁরা এক্সপেরিমেন্ট করেন তাঁরা অনেকে স্যাম্পলের ওপরে নিজের নাম ও ডেট লিখে রাখেন। সেটা আপনিও জানেন বোধ হয়। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। লজঞ্চুসের খাপ দেখে আমি এর আসল মালিকর নাম জানতে পারি আর তাঁকে যোগাযোগ করি। তিনি কলকাতাতেই ছিলেন। আমি তাঁকে আজ এখানে আসতে বলি। আমার সৌভাগ্য উনি এসেছেন। তবে এটা স্বীকার করছি আপনি যে আমাদের সকাল থেকে ফলো করে এখানে এসে উপস্থিত হবেন সেটা আমি ভাবিনি। “
তারপর সেই তফাতে বসা ভদ্রলোককে বললেন ,”একবার এদিকে আসুন প্লিজ “
ভদ্রলোক ঘুরে তাকাতেই চমকে উঠলাম। তিনি আর কেউ নন প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্বয়ং শ্রী ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু !
ফেলুদা মৃদু হেসে অবিনাশ বাবুকে বললেন ,”প্রতিবেশীকে চিনতে পারছেন আশা করি | আমি ভেবেছিলাম শঙ্কু বাবুকে জিগেস করলে কিছুটা আলোর আভাস পাবো। কিন্তু আপনি আজ নিজে এখানে এসে আমার অনেক সুবিধা করে দিলেন। “
আমাদের দিকে এসে প্রফেসর শঙ্কু ফেলুদার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। তারপর বললেন , ” একটু খুলেই বলি। ফেলুবাবুর অনেক সুখ্যাতি গিরিডি থাকতে শুনেছি। তারপর যখন কোলকাতায় আসবো ঠিক করলাম তখন অবিনাশ বাবু বললেন লালমোহন বাবু ওনার সহপাঠি। অবিনাশবাবু যেমন আমাকে বৈজ্ঞানিক হিসাবে পাত্তা দেননা তেমনি আপনার ব্যাপারেও অবজ্ঞা করতে দেখেছি। তখনি ভাবলাম এক ঢিলে দুই পাখি মারবো। আমার নতুন আবিষ্কার vanishium যা খেলে লোকে দু ঘন্টা অদৃশ্য থাকবে সেটা দেখাবো আর আপনার মগজাস্ত্রের প্রমাণটাও দেবো। তাই ওনাকে দিয়েই প্লট সাজালাম জটায়ূবাবুকে ভ্যানিশ করে। কি অবিনাশ বাবু ? কেমন বুঝলেন “
অবিনাশ বাবু বত্রিশ পাটি দাঁত একসাথে বের করে বললেন “হেঁ হেঁ এক্কেবারে মোক্ষম “
*****************************************************************************************************
–শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয়)
শ্রী সত্যজিৎ রায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। এটি আমার একটি শ্রদ্ধার্ঘ মাত্র !

#SantanuStories

6 comments

  1. Sushobhan Mukherjee says:

    চমৎকার

  2. Somali Mazumdar says:

    Besh interesting. Dui kaal joyi fictional character k melanor idea ta bhalo laglo.

  3. Kaushik Sengupta says:

    Oshadharon…. apnar fan hoye gelam. Apnar aro lekha porar asha e roilam.
    Facebook e eta share korechi…

  4. Kalyan Kumar Mukhopadhyay says:

    In a single word ‘ fantastic ‘.
    In modern day language ‘ double dhamaka’
    ‘ Felu Mittir ‘ aar ‘ Professor Shank ‘

  5. Arpita bhattacharyya says:

    দারুণ লাগল নতুন ভাবে ফেলুদা পড়ে. Bravo

  6. Ragesri says:

    Orreee naaaaa!!! Ki dili!!! Shabash!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *