উল্টোরথ – শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

 

Santanu Mukherjee, SEO, Joy Mukherjee

অমিতাভ দাশগুপ্ত ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমে একবার আড়চোখে দেখে নিলো টিকিট ঘরের গায়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটাকে। তারপর হাতব্যাগটা গলায় ঝুলিয়ে ,ওভারব্রিজটা পেরিয়ে যখন সে স্টেশনের বাইরে এলো তখন বুঝলো যে গাছটার নিচে একটা ছোটোখাটো মেলা বসেছে। উল্টো রথের মেলা। জায়গাটার নাম কেয়াঝোরা। সিঙ্গল লাইন ট্রেন। একটা সকালে আর একটা বিকেলে। সকালের ট্রেনটা ধরে অমিতাভ কলকাতা থেকে এসেছে। বিকেলে ফিরে যাবে।

 

এই কেয়াঝোরাতে ষোলো বছর বয়স অবধি কাটিয়েছে অমিতাভ। মাধ্যমিক পাশ করে সে চলে যায় কলকাতায় বাবা মায়ের সাথে। তারপর থেকে আর কখনো আসা হয়নি। কেয়াঝোরার হালদার বাড়ির রথ খুব বিখ্যাত। তার চেয়ে বিখ্যাত রথের মেলা। ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই মেলা আর ওই রথের সাথে। বিশেষ করে মনে পড়ে পল্টুকে। পল্টু আর অমিতাভ ছিল দারুন বন্ধু। মেলায় বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটানো থেকে নাগরদোলা চড়া। সবই পল্টুর সাথে।
পল্টুর সাথে দেখা করাটাও ছিল অমিতাভর কেয়াঝোরাতে ফিরে আসার আরেকটা উদ্দেশ্য। কে জানে ও কোথায় আছে। স্টেশনের পরেই মাইতীদের দীঘি। তারপরেই রাধাবল্লভের মন্দির। এখানেই পল্টুর সাথে শেষ দেখা। অমিতাভর হাতে একটা ছোট ভেলভেটের ব্যাগ দিয়ে বলেছিলো ,” এটা পুঁতে ফেল। কাউক্কে এর কথা বলিসনা। আমি সময় মতো এসে নিয়ে যাবো “
অমিতাভ জিগেস করেছিল ,” কি আছে এতে ?”
চোখ গোল গোল করে পল্টু কানের কাছে মুখ এনে বলেছিলো , “যক্ষের ধন “
এই বলে পল্টু এক দৌড়ে মিলিয়ে গেছিলো। আর প্রায় সাথে সাথেই জমিদার বাবুর পেয়াদারা লাঠি সোটা নিয়ে এসে পড়লো সেখানে। অমিতাভকে দেখে জিগেস করলো ,” পল্টু কৈ ?”
অমিতাভ ব্যাগটা ততক্ষনে কোঁচোড়ে গুঁজে নিয়েছে। ভয়ে ভয়ে বললো , ” আমি জানিনা “
– “সত্যি বলছিস ?” চোখ পাকিয়ে একজন বললো
অমিতাভ শুধু মাথা নেড়ে বলেছিলো হ্যাঁ।
পেয়াদারা চলে গেলে স্টেশনের ধরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সে ব্যাগটা পুঁতে দিয়েছিলো। আর সে কোথায় পুঁতে ছিল সেটা পল্টুকে আর জানানোই হয়নি।
পরে শুনলো জমিদার বাবুর নায়েবের থেকে মাঝ রাস্তায় ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালায় পল্টু। পল্টুর বাবার খুব অসুখ। অনেক টাকার প্রয়োজন। কিন্তু চুরি গর্হিত কাজ আর তাই জমিদার বাবু কোনো সহানুভূতি দেখতে চাননি।
অমিতাভর বাবা চিন্তায় পরে গেলেন। এইসব চোরদের সংস্পর্শে এসে যদি ছেলে খারাপ হয়ে যায়। তাই ঠিক করলেন কলকাতায় চলে যাবেন।
অমিতাভ আজ জানেনা ওই ব্যাগে কি ছিল। অমিতাভ এটাও জানেনা পল্টু পরে এসেছিলো কিনা ওই ব্যাগ নিতে।
অমিতাভর মধ্যে একটা অপরাধ বোধ ছিল। সে পরোক্ষ ভাবে পল্টুর চুরিতে মদত দিয়েছে। আজ সে একজন নামজাদা অধ্যাপক।যে ছাত্র গোড়ার কাজ করে তার জীবনে এই কালির ছিটে শোভা পায়না। একটু ভেবে আবার স্টেশনের দিকে ফিরে গেলো অমিতাভ। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দোকান বসেছে। একটু ভীড় ও আছে। যদিও পেছন দিকটা ফাঁকা আর ওখানেই অমিতাভ ব্যাগটা পুঁতেছিলো। দুপুর হতেই ভীড়টা হালকা হয়ে এলো আর এক সময় জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেলো। এই সুযোগ। একটা কঞ্চি নিয়ে মাটি সরাতে শুরু করলো অমিতাভ। দুএকজন লোক দেখে জিগেস করলো আর অমিতাভ সাথে সাথে গল্প বানিয়ে উত্তর দিলো যে এখানকার মাটির নমুনা নিয়ে কলকাতায় সে টেস্ট করতে নিয়ে যাবে। গ্রামের সরল মানুষেরা তাই বিশ্বাস করলো আর তার যাতে নমুনা সংগ্রহের কোনো ব্যাঘাত না হয় তার ব্যবস্থাও করে দিলো। একজন কোত্থেকে একটা শাবল এনে দিলো। বেশ কিছুক্ষন খোঁড়ার পর অমিতাভ দেখলো একটা লাল কিছু উঁকি দিচ্ছে। কোনো সন্দেহ নেই ওটাই সেই ব্যাগ। মাটি সরিয়ে সন্তর্পনে ব্যাগটা বের করে আনলো। তারপর সেটা খুলে উপুড় করলো মাটিতে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো কিছু একশ টাকার নোট । দু হাজার টাকা | এগুলো যক্ষের ধন ? পল্টু এটা চুরি করে পালাচ্ছিল? কিছুই মাথায় ঢুকলোনা অমিতাভর। যাই হোক এবারে আসল কাজ। স্বীকারোক্তি। জমিদার বাবুর কাছে গিয়ে জানাতে হবে যে সেই পল্টুকে চুরিতে সাহায্য করেছিল।
ব্যাগটা আর লোক দেখানো কিছু মাটি নিয়ে অমিতাভ রওনা দিলো জমিদার বাড়ির দিকে। উল্টো রথে হৈ হৈ কান্ড। একটু পরে জমিদার বাড়ির রথ বেরোবো। প্রস্তুতি ও ব্যস্ততা তুঙ্গে। কোনোক্রমে ভিড় বাঁচিয়ে অমিতাভ এসে দাঁড়ালো নাট মন্দিরে। একজন জোয়ান লোক উঠোন ঝাঁট দিছিলো। তাকেই জিগেস করলো ,”জমিদার বাবু আছেন ?”
লোকটা একটা পেন্নাম ঠুকে বললো ,” কাকে চান ?”
অমিতাভ বললো ,” জমিদার দেবদত্ত হালদার মশাইকে “
-আজ্ঞে উনি তো আর নেই
-নেই মানে ?
– মারা গেছেন গেলো বছর। জামাইবাবু আছেন। ডেকে দিচ্ছি
জামাইবাবু মানে নিশ্চই জমিদার বাবুর জামাই। উনার তো একটি মেয়ে ছিল। সুনয়না।
একটুপরে একজন সৌমদর্শন পুরুষ এসে অমিতাভর সামনে দাঁড়ালেন। হাত জোড় করে নমস্কার করে বললেন ,” দেবদত্ত বাবু আমার শ্বশুর মশাই হতেন। আমি কি কোনো সাহায্য করতে পারি ?”
অমিতাভ একটু ইতস্তত করে বললো , “আমার ছেলেবেলা এই গ্রামে কেটেছে। জমিদারবাবুর একটা জিনিস আমার কাছে রাখা ছিল। সেটা ফেরত দিতে চাই “
ভদ্রলোক বললে ,” কই দেখি কি জিনিস ?”
অমিতাভ ব্যাগটা বের করে দিলো।
ব্যাগটা হাতে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখে ওটা খুলে ফেললেন দেবদত্ত বাবুর জামাই। কিছু ধুলো মাখা টাকা বেরিয়ে এলো।
সেগুলো হাতে নিয়ে প্রশ্ন করলেন জামাইবাবু। “আপনার কাছে গেলো কি করে ?”
লজ্জায় পল্টুর কথা চেপে অমিতাভ বললো এক সিঁধেল চোর চুরি করে পালাবার সময় তার হাত থেকে পরে যায়। এতদিন সে সাহস কুলিযে এসে বলতে পারেনি। তাঁর এই গর্হিত কাজের জন্য সে ক্ষমা প্রাথী।
এইটুকু বলে অমিতাভ দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো আর সাথে সাথেই চেনা গলায় কে ডাকলো ” বিশু “
বিশু অমিতাভর ডাক নাম। এ নাম তাকে অনেকদিন কেউ ডাকেনি। চকিতে ঘুরে তাকালো অমিতাভ। অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেলো পল্টু !
পল্টু ওরফে জমিদারবাবুর জামাই মুচকি হাসছে। অমিতাভর সব গুলিয়ে যাচ্ছে। পল্টু নিজেই শেষে এগিয়ে এসে বললো ,”পেয়াদা গুলো ধরে ফেলেছিলো। জমিদার বাবুর কাছে বিচার করতে নিয়ে যায়। উনি দয়াবান মানুষ। পুলিশে না দিয়ে বললেন, “ওকে জমিদার বাড়িতে রেখে সংশোধন করবো। “
সেই থেকে এখানেই থেকে গেলাম। বাবাকেও সুস্থ করলেন জমিদার বাবু। আমায় বিলেত পাঠিয়ে ডাক্তার বানালেন। আর তারপর ওঁর মেয়ের সাথে বিয়ে। এখানে শ্বশুর মশাইয়ের নামে একটা হাসপাতাল করেছি। “
অমিতাভ থ মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। পল্টু এগিয়ে এসে ওর হাত ধরে টেনে বললো , আরও অনেক কথা আছে। এখন ওপরে চল। আজ আর ছাড়ছিনা। কাল দুপুরে খেয়ে তারপর যাবি। এখন চল রথ বেরোবে। দড়িতে টান দিয়ে দুজন মিলে মেলায় যাবো। দেখবো তোর বন্দুকের টিপ্ এখনো কেমন আছে ?”
…………………………………….
শান্তনু মুখোপাধ্যায় (জয় )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *